শাইখুল ইসলাম যাকারিয়া আনসারী রহিমাহুল্লাহ

ইমাম শাফেঈ রহিমাহুল্লাহ মসজিদ ও মাকবারা কমপ্লেক্সের এক কোণায় আরেকটা কবর আছে। এই কবরটা কারো নজর কাড়ে না। আমার ছবির সাথে কবরটা ইমাম শাফেঈর। দ্বিতীয় ছবিটা সেই কোণার কবর। কবর কোণায় হতে পারে কিন্তু ব্যক্তিটা কে ছিলো জানেন? শাইখুল ইসলাম হাফিজুল হাদিস আল্লামা যাকারিয়া আল আনসারী রহিমাহুল্লাহর। অনেকেই তাকে চেনে না। কিন্তু এমন ব্যক্তিত্ব ইসলামের ইতিহাসে খুবই বিরল। ইমাম শাফেঈ রহিমাহুল্লাহকে সবাই জানে তাই ইমামের কথা না বলি। আজ শাইখুল ইসলাম যাকারিয়া আল আনসারীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিই চলুন।

শাইখুল ইসলাম যাকারিয়া আনসারী রহিমাহুল্লাহ ছিলেন মহান হাফিজুল হাদিস ও সর্ববিদ্যার অধিকারী আলিম। ছিলেন সুলতান কায়তবায় আমলের প্রধান বিচারপতি। তার মুখস্থ শক্তি ছিলো ভয়াবহ রকমের প্রখর। ছোটবেলায় কুরআন তো হিফজ করেছিলেনই পাশাপাশি যা পেতেন তা জ্ঞানের যে শাখারই হোক না কেন ধুমধাম মুখস্থ করে ফেলতেন। উমদাতুল আহকাম যেমন মুখস্থ করেছিলেন তেমনি মুখস্থ করেছিলেন ইমাম ইবনে মালিকের আরবী ব্যকরণ সংক্রান্ত কিতাব আল আলফিয়্যাতুন নাহবিয়্যাহ। ইমাম শাতিবী রহিমাহুল্লাহর কিরাআত বিষয়ক কিতাব শাতিবিয়্যাহও মুখস্থ করে ফেলেছিলেন শৈশবে। কিছুই বাদ রাখেননি।

এরপর আযহারে ভর্তি হয়ে যান। কেউ ইলমের জন্য কষ্ট করলে যে আল্লাহ তায়ালা তার দীল ইলমে ভরে দেন এর চাক্ষুষ প্রমাণ শাইখুল ইসলাম যাকারিয়া রহিমাহুল্লাহর জীবন। পারিবারিকভাবে দরিদ্র ছিলেন তাই খাওয়া দাওয়া করার মত টাকা পয়সাও থাকতো না পকেটে। সমসাময়িক সহপাঠী বড় আলিম সবাই ধনশালী ছিলেন। যাকারিয়া আনসারী ক্ষুধার যন্ত্রণায় গভীর রাতে আযহার থেকে বের হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা তরমুজের খোসা কুড়িয়ে ধুয়ে খেয়ে ক্ষুধার জ্বালা মেটাতেন। আহা! তবুও ছাড়েননি ইলমচর্চা। আল্লাহ তায়ালাও ইলমের নিয়ামতে এই আলিমের ক্বলব একদম কানায় কানায় পূর্ণ করে দিয়েছিলেন।

শায়খ আনসারী শুধু ফিকহ-তাফসির-হাদীস ও ধর্মীয় জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি ভাষাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যামিতি, সময় নির্ধারণের জ্ঞান, ফারায়েয, বীজগণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র, ইলমুল আরূদ (ছন্দবিদ্যা), হুরূফবিদ্যা, তাসাউফ, সুন্দর লেখার কৌশল তথা খত্ব এবং গবেষণার নীতি ও আদবও অর্জন করেন। তিনি এসব বিদ্যায় এমন দক্ষতা অর্জন করেন যে উক্ত শাস্ত্রসমূহের আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্ব থেকে ইজাযাহও লাভ করেন। তার যোগ্যতায় মুগ্ধ হয়ে পরবর্তীতে সুলতান কায়তবায় আল-জারকাসি (৮২৬–৯০১ হি.) তাঁকে সর্বোচ্চ বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন। কিন্তু তিনি প্রথমে এই পদ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান এবং বহু অনুরোধ ও তাগিদের পর গ্রহণ করেন।

যখন তাঁর জ্ঞান ও যোগ্যতার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে তখন লোকেরা তাঁর কাছে উপহার ও অনুদান পাঠাতে থাকে। এমনকি বিচারপতির পদ গ্রহণের আগেই প্রতিদিন তাঁর কাছে প্রায় তিন হাজার দিরহাম আসতো হাদিয়া হিসেবে। তিনি সেই অর্থে বিরল ও মূল্যবান বই সংগ্রহ করেন এবং নিজে যেহেতু ক্ষুধায় কষ্ট পেয়ে ইলম শিখেছেন তাই যেসব ছাত্র তাঁর কাছে পড়তো তাদের জ্ঞান ও অর্থ—দুই দিক থেকেই উপকৃত করতেন। তাদের ভরণপোষণও তিনি হাদিয়ার অর্থ থেকে নির্বাহ করতেন।

বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি সুলতানের কিছু কাজে সত্য থেকে বিচ্যুতি ও অন্যায় লক্ষ্য করেন এবং সাহসের সঙ্গে সুলতানকে চিঠি লিখে অন্যায় থেকে বিরত থাকতে উপদেশ দেন। এতে সুলতান রুষ্ট হয়ে তাঁকে পদচ্যুত করেন। এরপর তিনি পুনরায় শিক্ষা ও গবেষণার কাজে ফিরে যান এবং জীবনের শেষ পর্যন্ত সেই পথেই অবিচল থাকেন। অনেক লম্বা হায়াত পেয়েছিলেন। জীবনের শেষ দিকে অন্ধ হয়ে গেছিলেন। অনেক কিতাবাদি রচনা করেছিলেন। প্রসিদ্ধ হিসেবে আছে সহিহ বুখারীর ব্যাখা – তুহফাতুল বারী।

তারাই তো আমাদের পূর্বসূরি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের রুহ ও তাদের রুহ আলমে বারজাখে মিলিয়ে দিন। আমিন।