ইমাম শাতিবী রহিমাহুল্লাহ

আযহারের কিরাআত ডিপার্টমেন্ট কায়রোর বাইরে তনত্বা এলাকায়। যেখানে আলী তানত্বাভী রহিমাহুল্লাহর অরিজিন। তো আমরা যত মিশরীয় বা আযহার থেকে কিরাআতে অনার্স করা ক্বারী সাহেব দেখি দেশ বিদেশের তারা সবাই এই ডিপার্টমেন্ট থেকেই পাশ করা। এই ডিপার্টমেন্টে একটা কিতাব পড়ানো হয় যার নাম ‘হিরযুল আমানি ওয়া ওয়াজহুত তাহানি ফিল কিরাআত’। এই কিতাব হচ্ছে কিরাআত জগতের সহিহ বোখারী। মানে আপনি যদি প্রফেশনাল ক্বারী হতে চান অথবা পৃথিবীর যত প্রসিদ্ধ ক্বারী দেখা যায় সকলেরই এই হিরযুল আমানি মুখস্থ করতে হয়। এই কিতাব মূলত প্রায় বারোশত পংক্তির একটা কবিতা অথবা বারোশত কবিতার একটা কিতাব। এই কবিতার মূল অনন্যতা হলো এই কবিতা ইলমুল কিরাআতের যাবতীয় নিয়মনীতি ও কুরআন তিলাওয়াতের যত পদ্ধতি সবকিছুর ভাণ্ডার। এই কিতাবের লেখক হচ্ছেন ইলমুল কিরাআত জগতের ইমাম ও পাইওনিয়র ইমাম শাতিবী রহিমাহুল্লাহ। আমি যে কবরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি সেটাই ইমাম শাতিবীর কবর। যিনি কিরাআত জগতের ইমাম বোখারী ও কিরাআতের প্রাতিষ্ঠানিক রূপের জনক।

তিনি ছিলেন আবু মুহাম্মদ আল-কাসিম ইবন ফিরা ইবন আবিল কাসিম খালাফ ইবন আহমদ আর-রুয়াইনি আশ-শাতিবি আল-দারির (অন্ধ)। তিনি শাফেঈ মাযহাবের আলিম ছিলেন। জন্মগ্রহণ করেন ৫৩৮ হিজরিতে আন্দালুসের পূর্বাঞ্চলের একটি বড় শহর শাতিবায়। যে শহর থেকে বহু আলেম বের হয়েছেন।

শাতিবী ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। পাশাপাশি ছিলেন পরহেজগার- তাকওয়াবান ও গম্ভীর স্বভাবের একজন আল্লাহভীরু মানুষ। তিনি সাত কিরাআতের উপর বিখ্যাত আশ-শাতিবিয়্যাহ কবিতার গ্রন্থ রচনা করেন যা আগে কেউ করেননি এবং পরেও কেউ তাঁর সমকক্ষ হতে পারেননি। এতে এমন সব প্রতীকী ইঙ্গিত রয়েছে যা কেবল অভিজ্ঞ ও সূক্ষ্মদৃষ্টি সমালোচকই অনুধাবন করতে পারে। অথচ তিনি ছিলেন দৃষ্টিহীন।

এই গ্রন্থই বর্তমান যুগের ক্বারীদের মুখ্য অবলম্বন। কারণ কিরাআত শিক্ষায় খুব কম মানুষই আছেন যারা এই কিতাবের হিফজ ও জ্ঞানকে অগ্রাধিকার দেন না। তার আরও একটি দালিয়া নামের কবিতা রয়েছে যা প্রায় পাঁচশো কবিতার সমন্বয়ে গঠিত। তিনি কিরাআত, রসম (লিপি), নাহু, ফিকহ ও হাদীসেও অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। নিজ শহর শাতিবায় তিনি আবদুল্লাহ ইবন আবিল আ‘আস আন-নাফরির কাছে সাত কিরাআতের কুরআন তিলাওয়াত শেখেন। পরবর্তীতে তিনি ভ্যালেন্সিয়া সফর করেন এবং সেখানে আবুল হাসান ইবন হুযায়লের কাছেও কিরাআত শিক্ষা গ্রহণ করেন।

তিনি কুরআনের তিলাওয়াত ও তাফসিরে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসে ছিলেন অনন্য এক ব্যক্তিত্ব। যখন তাঁর সামনে সহীহ বুখারী-মুসলিম ও মুয়াত্তা পাঠ করা হতো তিনি মুখস্থ থেকে পান্ডুলিপিগুলোর সংশোধন করতেন এবং প্রয়োজনীয় স্থানে টীকা ও ব্যাখ্যা দিতেন। অন্ধ ছিলেন কিন্তু এসব হাদিসের কিতাব ছিলো তার মুখস্থ। নাহু ও ভাষাবিজ্ঞানে তিনি ছিলেন অতুলনীয়।

তিনি অনর্থক কথা বলা থেকে বিরত থাকতেন। শুধুমাত্র পবিত্র অবস্থায় সুন্দর পোশাকে বিনয় ও নম্রতার সঙ্গে কথা বলতেন। গুরুতর অসুস্থ হলেও অভিযোগ করতেন না। দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন না। তিনি তাঁর জন্মভূমি ত্যাগ করে মিসরে চলে যান। তার নিজ দেশ ত্যাগের কারণ ছিল তাকে সেখানে খতিব হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। তিনি হজের অজুহাতে দেশ ত্যাগ করেন এবং আর ফিরে যাননি। কারণ সেখানে খতিবদের রাজাদের প্রশংসাসূচক এমন সব শব্দ ব্যবহার করতে বাধ্য করা হতো যা তিনি শরীয়তের দৃষ্টিতে অনুমোদিত মনে করতেন না। তিনি চরম দারিদ্র্য সত্ত্বেও ধৈর্য ধারণ করেন।

মিসরে তিনি আস-সিলাফি থেকে শ্রবণ করেন। কাযী আল-ফাযিল তাঁকে নিজের প্রতিষ্ঠিত মাদরাসায় কিরাআত বিভাগের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি কিছু শর্তে তা গ্রহণ করেন এবং সেখানে পাঠদান শুরু করেন। অল্প সময়েই তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং মিসরে ইলমুল কিরাআতের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব তাঁর হাতেই এসে পৌঁছায়। তার থেকে অসংখ্য মানুষ উপকৃত হয়।

তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস সফর করেন এবং সেখানে একবার রমাদ্বান মাস রোজা রেখে অতিবাহিত করেন। পরে কায়রোতে ফিরে আসেন। সেখানেই ২৮ জমাদিউস সানিতে তাঁর ইন্তিকাল হয়। তাঁকে কারাফা কবরস্থানে কাযী আল-ফাযিলের মাজারের কাছে দাফন করা হয়।

এই কবরের চাবি এখন ওয়াযারাতুল আওকাফের কাছে আছে। খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়েছে। তবুও বের করেছি। ইলমুল কিরাআত আমার আগ্রহের জায়গা। ইমাম শাতিবীর প্রতি আমার ভালোবাসা আমাকে এই কবর খুঁজে বের করিয়েছে আলহামদুলিল্লাহ।