আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ূতি রহিমাহুল্লাহ

আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ূতি রহিমাহুল্লাহ

মিশর সরকার চার লেনের রাস্তা সম্প্রসারণের কাজ শুরু করেছে। আশেপাশে অনেক কবর ভেঙে সমান করে ফেলা হচ্ছে। কারো কারোটা সালাফ কোনো আলিমের। খুব বেশি প্রসিদ্ধ হলে দেহাবশেষ অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এরমধ্যে অনেকগুলো কবর পাড়ি দিয়ে ভাঙা রাস্তা মাড়িয়ে এক পুরনো কবরে গেলাম। সবকিছু পুরনো হলেও এখানে যিনি শুয়ে আছেন যুগ থেকে যুগান্তরে তার রেখে যাওয়া চিহ্ন এখনো প্রস্ফুটিত কলির মত তরতাজা। তিনি আর কেউ নন। দ্য গ্রেটেস্ট অফ হিজ টাইম আল্লামাতুত দাহর আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ূতি রহিমাহুল্লাহ। আল্লামা সুয়ূতিই তার সময়ের সম্ভবত একমাত্র আলিম যিনি বইপত্রের মাঝে জন্ম নিয়েছিলেন এবং পারিবারিক সুত্রে অল্প বয়সেই ইলমের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। তার সময়ের আশ্চর্যজনক রচনার সংখ্যাও তার।

তিনি হলেন জালালুদ্দিন আবদুর রহমান ইবনু আবি বকর ইবনু মুহাম্মাদ ইবন সাবিকুদ্দীন আল-খুজাইরি আস-সুয়ূতি। যিনি জালালুদ্দিন সুয়ূতি নামে প্রসিদ্ধ। তিনি জন্মগ্রহণ করেন কায়রোতে ৮৪৯ হিজরি ১৪৪৫ খ্রিস্টাব্দে এবং মৃত্যুবরণ করেন কায়রোতেই ৯১১ হিজরিতে ১৫০৫ খ্রিস্টাব্দে। তিনি ছিলেন একাধারে হাফিজে কুরআন ও মুফাসসির। ছিলেন ঐতিহাসিক সাহিত্যিক ও শাফেয়ী ফকিহ। তার রচনার সংখ্যা প্রায় ছয়শত। তার উপাধি ছিল ইবনুল কুতুব বা বইয়ের সন্তান। কারণ তার পিতা যখন মায়ের কাছে একটি বই চেয়েছিলেন তখন তার মায়ের প্রসব বেদনা শুরু হয় এবং তিনি ঘরের বইগুলোর মাঝেই সন্তান প্রসব করেন। তাই বাবা তাকে আদর করে নাম দেন – ইবনুল কুতুব।

জালালুদ্দিন সুয়ূতি এমন এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন যার বংশসূত্র পৌঁছায় আহলে হাকীকত ও তাসাউফের একজন বিশিষ্ট শায়খ হামামুদ্দীন আল-খুজাইরির দিকে। যার নাম থেকে বাগদাদের আল-খুজাইরিয়া মহল্লার নামকরণ। তবে সুয়ূতি নিজে উল্লেখ করেছেন তিনি আনসারী ও জাফারী বংশোদ্ভূত। তিনি কায়রোতে অনাথ অবস্থায় বেড়ে ওঠেন। তার পিতা মারা যান যখন তার বয়স মাত্র পাঁচ বছর। ইমাম সুয়ূতির পিতাও আলিম ছিলেন। তিনি নিজ শহর আসিউতে শাসনকার্যের দায়িত্বও পালন করেছিলেন সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে। তিনি কায়রোতে হাফিজ ইবনু হাজার আসকালানির কাছে সহীহ মুসলিম পড়েছিলেন এবং ফিকহ ও কালামের জ্ঞান অর্জন করেছিলেন ইমাম শামসুদ্দীন আল-কিয়াতির কাছ থেকে।

ইমাম সুয়ূতির জীবন ছিল জ্ঞানচর্চা ও ইলমি রিহলায় পূর্ণ এক জীবন। জীবনের পুরোটা সময় তিনি ইলম অর্জনের জন্য ভ্রমণ করেছেন। বহু আলিমের সাহচর্যে থেকেছেন। তিনি এমন এক আলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যার দাদা আহলে হাকীকত ও মাশায়িখে তরিকতের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তার পিতা ছিলেন ফিকহ-ফারায়েজ ও আরও বহু শাস্ত্রে প্রজ্ঞাবান এক ইমাম। সুয়ূতি কায়রো শহরে বেড়ে ওঠেন। ছোট্ট সুয়ূতি একদিন পিতার সঙ্গে আসকালানির দরসে অংশগ্রহণ করেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র তিন বছর। তিনি পিতার জীবদ্দশায় কুরআনের সুরা আত-তাহরীম পর্যন্ত মুখস্থ করেছিলেন। ছয় বছর বয়সে তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। এরপর তার অভিভাবক হন শায়খ জামালুদ্দীন ইবনুল হুমাম।

সুয়ূতি আট বছর বয়সে কুরআন সম্পূর্ণ মুখস্থ করেন। শৈশব থেকেই তার অসাধারণ মেধা ও স্মৃতিশক্তির পরিচয় মেলে। কুরআন হিফজের পর তিনি আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ মুখস্থ করেন। যেমন উমদাতুল আহকাম ও ইমাম নববীর আল-মিনহাজ ফিল ফিকহ এবং আল-মিনহাজ ফিল উসূল। ইবন মালিকের আলফিয়্যা এবং তাফসিরে বাইযাভি। তিনি তখনকার শায়খদের সামনে এসব মুখস্থ অংশ উপস্থাপন করতেন। পনেরো বছর বয়সে পৌঁছার আগেই তিনি ইলমি রিহলাহ শুরু করেন। তিনি দামিয়াত থেকে আলেকজান্দ্রিয়া এবং ফাইয়ুম থেকে মাহাল্লা শহরে গমন করেন। এরপর আল্লাহর ঘর বায়তুল্লাহ শরীফে হজ আদায়ের জন্য মক্কায় যাত্রা করেন এবং সেখানে পূর্ণ এক বছর অবস্থান করেন। পরবর্তীতে তিনি শাম ও মাগরিব এবং বর্তমান গিনি অঞ্চলেও সফর করেন। তিনি বহু আলিমের কাছ থেকে ইলম শেখেন। ইমাম সুয়ূতি এমন এক যুগে বাস করতেন যখন জ্ঞানের প্রায় প্রতিটি শাখায় বহু মহীরূহ আলিম ছিলেন। তারা ইসলামী শাস্ত্র ও ভাষাতত্ত্ব এবং সাহিত্য সৃষ্টিতে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিলেন। সুয়ূতি এই বিশিষ্ট আলিমগণের প্রভাবেই গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। যেমন শামস মুহাম্মাদ ইবন মূসা আল-হানাফি। আশ-শামুস আল-বামী। ইবনুল ফালাতি ও ইবন ইউসুফ। আল-আজলুনি ও আন-নু‘মানি প্রমুখ। তাঁদের কাছ থেকে তিনি ফিকহ এবং নাহু ও অন্যান্য শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। ফরায়েজ শাস্ত্রে তিনি শিক্ষালাভ করেন শায়খ শিহাবুদ্দীন আশ-শারমাসাহির কাছ থেকে।

সতেরো বছর বয়সে তাকে আরবি ভাষা শেখানোর অনুমতি দেওয়া হয়। এ সময় তিনি ইস্তিআযা ও বিসমিল্লাহ নিয়ে একটি বই রচনা করেন যা প্রশংসা করেন শায়খুল ইসলাম আলিমুদ্দীন আল-বুলকিনী। সাতাশ বছর বয়সে তিনি পাঠদান ও ফতোয়া প্রদান শুরু করেন। এই পর্যায়ে তিনি ইবন মালিকের আলফিয়্যার ব্যাখ্যা ও ‘জামউল জাওয়ামি ফিল আরাবিয়া’ নামে একটি গ্রন্থ লেখেন এবং তা তার শিক্ষক তাকিুদ্দীন আশ-শামসির সামনে উপস্থাপন করলে তিনি প্রশংসা করেন। সুয়ূতি দীর্ঘদিন শায়খ শরফুদ্দীন আল-মুনাওয়ির সাহচর্যে ছিলেন এবং তাঁর কাছ থেকে ফিকহ ও তাফসির গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। সুয়ূতির শিক্ষালাভের একটি বিশেষ পদ্ধতি ছিলো। তিনি এক সময়ে কেবল একজন শায়খের সাহচর্যে থাকতেন এবং তার মৃত্যু হলে অন্য শিক্ষকের কাছে যেতেন। তার প্রধান শিক্ষক ছিলেন মুহিউদ্দীন আল-কাফিজি যার সঙ্গে তিনি টানা চৌদ্দ বছর অবস্থান করেন এবং তার কাছ থেকেই অধিকাংশ ইলম অর্জন করেন। তিনি সুয়ূতিকে উস্তাযুল উজুদ বলে অভিহিত করতেন। আল-কাফিজি তাকে তাফসির ও আরবি উসূল এবং মাআনি শাস্ত্রে ইজাযত (সনদ) প্রদান করেন। পাশাপাশি তিনি শায়খ সাইফুদ্দীন আল-হানাফির দরসেও নিয়মিতভাবে উপস্থিত থেকে ইলম শিখতেন।

শুধু হাদিস শাস্ত্রেই তিনি প্রায় ১৫০ জন বিশিষ্ট আলিমের কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করেন। তার শিক্ষাগ্রহণ শুধু পুরুষ আলিমগণের কাছেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বেশ কিছু মহিলার কাছ থেকেও ইলম অর্জন করেছিলেন যারা সে যুগের উচ্চপদস্থ ও বিশিষ্ট আলিমা ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: আসিয়া বিনতু জারুল্লাহ ইবন সালিহ। কামালিয়া বিনতু মুহাম্মদ আল-হাশিমিয়া। উম্মু হানি বিনতু আবিল হাসান আল-হারউইনিয়া। উম্মুল ফাজল বিনতু মুহাম্মদ আল-মাকদিসিয়া প্রমুখ।

জালালুদ্দিন সুয়ূতি রহিমাহুল্লাহ বিপুলসংখ্যক গ্রন্থ ও পুস্তিকা রচনা করেছেন। সুয়ূতির রচনার সংখ্যা তিনশত গ্রন্থ ও পত্রেরও বেশি। জার্মান প্রাচ্যবিদ ব্রোকলমান তার চারশত পনেরোটি গ্রন্থের তালিকা করেছেন। হাজী খলিফা তাঁর কাশফুয যুনূন গ্রন্থে প্রায় পাঁচশত ছিয়াত্তরটি রচনা উল্লেখ করেছেন। এবং ইবন ইয়াসের মতে তার রচনার সংখ্যা পৌঁছেছিল ছয়শতে। তিনি তাফসির, ফিকহ, হাদীস, উসূল (ইসলামী আইনতত্ত্ব), নাহু (ব্যাকরণ), বালাগাত (অলঙ্কার ও ভাষার শৈলী), ইতিহাস, তাসাউফ (আধ্যাত্মিকতা), সাহিত্য এবং আরও বহু বিষয়ে রচনা করেছেন। এইসব রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে তাঁর অসংখ্য বিশিষ্ট ও প্রভাবশালী গ্রন্থ যা ইসলামী জ্ঞানের প্রায় সব শাখাকে আচ্ছাদিত করেছে।

জালালুদ্দিন সুয়ূতির এত বিপুল রচনাকর্ম সম্ভব হয়েছিলো নির্জনতার কারণে। তিনি চল্লিশ বছর বয়সের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে কর্মজীবন ও সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে লেখালেখিতে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। এর পাশাপাশি ছিল তার বিশাল গ্রন্থাগার ও জ্ঞানের প্রাচুর্য। অসংখ্য শিক্ষক ও রিহলাহর অভিজ্ঞতা এবং দ্রুত লেখার ক্ষমতা। তার রচনাজীবন দীর্ঘ ছিল প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর। তিনি মাত্র সতেরো বছর বয়সে লেখালেখি শুরু করেন এবং টানা বাইশ বছর সম্পূর্ণভাবে এর জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেন। যদি তার লিখিত কাগজের পরিমাণ জীবনের দিনসংখ্যায় ভাগ করা হয় তবে প্রতিদিন গড়ে চল্লিশ পৃষ্ঠা লিখেছেন বলা যায়। চল্লিশ বছর বয়সে পৌঁছে তিনি মানুষজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান এবং নীলনদের তীরে রাওদাতুল মিকইয়াস নামে স্থানে নির্জনে অবস্থান নিতে শুরু করেন। তিনি সেখানে একাকী জীবনযাপন করেন। এমনকি তার ঘনিষ্ঠ সাথীদের সঙ্গেও সম্পর্ক ছিন্ন করেন যেন কাউকেই চিনতেন না। এই নির্জন জীবনে থেকেই তিনি তার অধিকাংশ বই রচনা করেন।

ধনী ও অভিজাতরা তাকে দেখতে আসতেন। অর্থ ও উপহার দিতেন কিন্তু তিনি সব ফিরিয়ে দিতেন। সুলতান একাধিকবার তাকে ডেকেছিলেন ও উপহার পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি উপস্থিত হননি এবং উপহারও গ্রহণ করেননি। এই অবস্থাতেই তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্থির ছিলেন।