আল্লামা কামালুদ্দীন ইবনুল হুমাম রহিমাহুল্লাহ

হানাফি ফিকহের সংবিধান বলা যায় ‘হিদায়া’ কিতাবকে। হানাফি ফিকহ বুঝতে হলে হিদায়া ভালোভাবে বুঝতে হবে। আর এই হিদায়া বোঝার জন্য সর্বজনবিদিত ও অনন্য ব্যাখাগ্রন্থ হলো – ফাতহুল কদীর। আট খণ্ডের এই সুবিশাল কিতাবে হিদায়ার সমস্ত রস যেন নিংড়ে নিংড়ে বের করা হয়েছে। আর একাজটি করেছেন এক মহান ফকিহ ও সুফী দরবেশ আল্লামা কামালুদ্দীন ইবনুল হুমাম রহিমাহুল্লাহ। তিনি ছিলেন এমন ইমাম যার দারসে তার উস্তাদ ইবনে হাজার আসকালানি পর্যন্ত বসেছিলেন।

এই মহান ফকিহের কবরের যিয়ারত আমার নসীব হয়েছে কায়রো এসে আলহামদুলিল্লাহ। হানাফি ফিকহের এই ফকিহের জীবন ও শিক্ষাদীক্ষা এত বৈচিত্র্যময় ছিলো যে বললে অবাক হয়ে যাবেন। চলুন বলি আপনাদেরকে মহান এই ফকিহের ব্যাপারে।

কামালউদ্দিন মুহাম্মদ ইবনু হুমামুদ্দিন আব্দুল ওয়াহিদ ইবনু সাদুদ্দিন আব্দুল হামিদ রহিমাহুল্লাহর জন্ম আলেকজান্দ্রিয়ায়। তাঁর পরিবার ছিল বিচারকদের পরিবার। যারা মূলত তুরস্কের আনাতোলিয়ার কেন্দ্রস্থল সিওয়াস (سيواس) নগরীর অধিবাসী। তাঁর পিতা থেকে পিতামহ ও প্রপিতামহ সবাই ঐ নগরীতে বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর পিতা কায়রোতে আসেন হানাফি ফিকহের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার জন্য। পরে তিনি আলেকজান্দ্রিয়ার বিচারপতি হন এবং সেখানেই মরক্কোর এক মালিকি বিচারপতির কন্যাকে বিয়ে করেন। ৮০১ হিজরিতে তাঁর পিতা মৃত্যুবরণ করেন। তখন দশ বছর বয়সী কামালউদ্দিন নানীর তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন। নানী তার বিচারকদের বংশধর হিসেবে নাতির উপযুক্ত শিক্ষার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেন। কামালউদ্দিন কুরআনের একটি অংশ হিফজ করেন শায়খ জাইনুদ্দিন আবদুর রহমান ইবনু মনসুর আল-ফাকিরি আল-মালিকির কাছে যিনি আলেকজান্দ্রিয়ার পশ্চিম জামে মসজিদের খতিব ও ইমাম ছিলেন।

এরপর তাঁর নানী তাঁকে কায়রোতে নিয়ে যান। যেখানে তিনি শায়খ শিহাবুদ্দিন আল-হায়ছামীর কাছে কুরআন সম্পূর্ণ হিফজ সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি তাজবিদ শেখেন বিখ্যাত কারি মুহাম্মদ ইবনু আলী আয-যুরাতিতি আল-হানাফির কাছে। ফিকহে হানাফি শাখায় তিনি মুখতাসারুল কুদুরী ও মানারুল আনওয়ারের মত কিতাব মুখস্থ করে ফেলেন। যামাখশারীর কিতাব আল-মুফাসসাল ও নাহুতে আলফিয়াত ইবনু মালিক মুখস্থ করেন।

এরপর তাঁর নানী তাঁকে আবার আলেকজান্দ্রিয়ায় ফিরিয়ে আনেন। সেখানে তিনি নাহু শিখেন হানাফি বিচারপতি জামালুদ্দিন ইউসুফ ইবনু মুহাম্মাদ আল-হুমাইদির কাছে। কামালউদ্দিন ফিকহে হানাফি অধ্যয়ন করেন জাইনুদ্দিন আল-ইসকান্দারির কাছে। তাঁর কাছেই তিনি হিদায়ার কিছু অংশের দারস নেন। পরে ইবনুল হুমাম পুনরায় কায়রো ফিরে আসেন এবং যুক্তিবিদ্যা (المنطق) অধ্যয়ন করেন যুগের বিশিষ্ট আলেম ইজ্জুদ্দিন আল-বাগদাদির (আব্দুস সালাম ইবনু আহমদ) কাছে। আকিদাহ ও কালাম অধ্যয়ন করেন ইমাম শামসুদ্দিন আল-বাসাতি আল-মালিকির কাছে।

ইবনুল হুমাম তাফসীর অধ্যয়ন করেন আল-হামামুদ্দিন আল-খাওয়ারিজমি আশ-শাফেয়ির কাছে। হাদিস শোনেন কামালুদ্দিন আশ-শুমুন্নি আল-মালিকির কাছে। আল-জামালিয়াহ এলাকায় বসবাসকালে তিনি শুমুন্নির সংস্পর্শে অধিক সময় কাটাতেন। তাফসির অধ্যয়ন করেন শায়খ বদরুদ্দিন আল-আকসরাইয়ের কাছে। তাঁরা আলোচনায় এমন গভীরভাবে প্রবেশ করতেন যে কখনোই সহজে উপসংহারে পৌঁছাতে পারতেন না। ৮১৮ হিজরিতে মক্কা থেকে কায়রোতে আগমন করেন প্রসিদ্ধ আলেম ও মুতাকাল্লিম কুতবুদ্দিন মুহাম্মদ আল-আবরাকুহি। ইবনুল হুমাম তাঁর কাছে শরহুল মাওকিফের দরস করেন এবং বলেন: আমার শিক্ষকদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী ছিলেন তিনি।

ইবনুল হুমাম বদরুদ্দীন আইনী রহিমাহুল্লাহর কাছে আল-মু‘আল্লাকাতুস সাবআ ও জুমহরাতু আশআরিল আরব পড়েন। আইনী তখন কায়রোর আল-মুয়াইয়্যিদিয়াহ মাদরাসার প্রধান ছিলেন এবং ইবনুল হুমামকে সেখানে মুহাদ্দিস হিসেবে নিযুক্ত করেন। ৮১৪ হিজরিতে আল্লামা মুহিব্বুদ্দিন ইবনুশ-শুহনার সঙ্গে ইবনুল হুমাম হালব সফর করেন। ইবনুশ-শুহনা রাজনীতি-সংক্রান্ত কারণে ৮১৩ হিজরিতে কায়রোতে এসেছিলেন। ইবনুল হুমাম তাঁর সংস্পর্শে থেকে হানাফি ফিকহ পড়েন এবং তাঁর সঙ্গে পরে হালব যান। ৮১৫ হিজরিতে শায়খ মৃত্যুবরণ করেন এবং মৃত্যুর আগে তাঁর ছাত্রকে কায়রো ফেরার খরচ দিয়ে যান।

ইবনুল হুমামের কণ্ঠ ছিল অত্যন্ত মধুর ও সুরেলা। বলা হয় দামেস্কে অবস্থানকালে যখন তিনি সুর করে কিরাআত পাঠ করতেন তখন তাঁর সৌন্দর্যময় কণ্ঠে মুগ্ধ হয়ে স্থানীয়রা তাঁকে হাদিয়া দিতো।

৮১৮–৮১৯ হিজরিতে তিনি পুনরায় হানাফি ফিকহ অধ্যয়ন করেন শায়খ সিরাজুদ্দিন উমর ইবনু আলী আল-খাইয়্যাতের কাছে। ইবনুল হুমাম হাফিয ইবনু হাজর আল-আসকালানির কাছেও অধ্যয়ন করেন এবং তাঁর থেকে ইজাজাহ পান। ইবনু হাজর তাঁকে আলিম ও আল্লামা বলে সম্মান করতেন।

তৎকালীন যুগে কোনো আলেমের পূর্ণ মর্যাদা তখনই হতো যখন তিনি তাসাউফের পথে প্রবেশ করতেন। ইবনুল হুমামও এ পথে অগ্রসর হন। তিনি শায়খ বুরহানুদ্দিন আল-আদকাওয়ি আশ-শাফেয়ি এবং শায়খ জাইনুদ্দিন আল-খাওয়াফি আল-হানাফির শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। খাওয়াফির সঙ্গে তিনি কুদস সফরে যান। যেখানে শায়খ তাঁর জন্য দুআ করেন: হে আল্লাহ তাঁকে কর্মনিষ্ঠ ও সৎ আলেম বানান।

তাঁর শিক্ষকবৃন্দ ছিলেন বিপুলসংখ্যক। তাঁদের মধ্যে এক অদ্ভুত চরিত্রের শায়খ ছিলেন জালালুদ্দিন আল-কাজুরি আল-কাজউইনি আশ-শাফেয়ি । তিনি অক্ষরবিদ্যা ও অওফাক (তাবিজ-তাবারক) এর জ্ঞান রাখতেন বলে পরিচিত ছিলেন। কায়রোতে এসে তিনি মাদরাসা আল-মানসুরিয়ায় বসবাস শুরু করেন। ইবনুল হুমামও তাঁর সঙ্গে কিছুদিন সেখানে ছিলেন।

যখন তাঁর শিক্ষা পূর্ণতা পায় তখনই তাঁর জ্ঞানের গভীরতা ও অনন্য বিশ্লেষণক্ষমতা তাঁকে সমসাময়িক আলেমদের মধ্যে অনন্য করে তোলে। তাঁর শায়খ কাজি জাইনুদ্দিন আত-তাফাহনি ৮২২ হিজরিতে হানাফি বিচারপতি নিযুক্ত হলে তাঁকে সহকারী বিচারক করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু ইবনুল হুমাম বিনয়ের সঙ্গে শর্ত দেন যেন তাঁকে আনুষ্ঠানিক আদালতে উপস্থিত থাকতে না হয়। পরিশেষে তিনি পদটি গ্রহণ না করেই প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন: আমি এমন নই যে আমার সমসাময়িকদের চেয়ে নিম্ন জ্ঞান রাখি।

৮২২ হিজরিতে তিনি প্রথম আনুষ্ঠানিক পদ লাভ করেন আল-মানসুরিয়াহ কুব্বাহ মাদরাসায় তাফসিরের উস্তাদ হিসেবে। এটি ছিল সুলতান ক্বালাউনের প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান। তাঁর প্রথম দারসে উপস্থিত ছিলেন তাঁর শিক্ষকগণ। ইবনু হাজর থেকে শুরু করে আল-বাসাতি ও কারিউল হিদায়া প্রমুখ ব্যক্তিত্বগণ। তিনি বিনয়ের সঙ্গে আসনে নিচে বসেন এবং এই আয়াত পাঠ করেন:

يؤتي الحكمة من يشاء ومن يؤت الحكمة فقد أوتي خيراً كثيرا

এর ব্যাখ্যা শুরু করেন এভাবে: এই আয়াত নিয়ে আলোচনা যেমন আসবে তেমনই করব। যেমন করা উচিত তেমন নয়। এই অনন্য নম্র বাক্যে শ্রোতারা মুগ্ধ হন। ইবনু হাজর তাঁর জ্ঞানের প্রশংসা করেন। আর আল-বাসাতি বলেন: তাঁকে কথা বলতে দিন। তিনি এমন কথা বলেন যার তুলনা নেই।

পরবর্তী জীবনে ইবনুল হুমাম রাজা-বাদশাহদের সঙ্গে মেলামেশা পরিহার করে কায়রোর উপকণ্ঠ তুরায় নির্জনে বসবাস শুরু করেন। যদিও ছাত্রদের পাঠদান অব্যাহত রাখেন। আলেমদের সাথে তাঁর বিনয় ছিল অতুলনীয়। একদিন তিনি বিখ্যাত আলেম আলাউদ্দিন আল-বুখারির মজলিসে গোপনে প্রবেশ করলে শায়খ তাঁকে সম্মান দিয়ে পাশে বসতে বলেন এবং বলেন: তোমার বিনয় এখানে নয় বরং রাজসভায় সত্য কথা বলাই বিনয়।

৮৪৭ হিজরিতে তিনি শায়খুনিয়া খানকাহর প্রধান নিযুক্ত হন। ৮৫৮ হিজরিতে তিনি পদত্যাগ করে হজের উদ্দেশ্যে মক্কা যান এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাসের ইচ্ছা করেন। কিন্তু অসুস্থ হয়ে পড়ায় ৮৬০ হিজরিতে মিশরে ফিরে আসেন এবং ৮৬১ হিজরির ৭ রমজানে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জানাযায় সুলতানসহ বহু মানুষ অংশগ্রহণ করেন। দাফন করা হয় কারাফা কবরস্থানে।

তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেন। যেগুলোর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো—

১. ফাতহুল কদীর – হানাফি ফিকহের বিশাল ব্যাখ্যাগ্রন্থ। এতে তিনি হানাফি মতের প্রমাণাদি এবং হাদিসের তাখরিজ ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তিনি ৮২৯ হিজরিতে গ্রন্থটি শুরু করেন কিন্তু মৃত্যুর (৮৬১ হিজরি) আগে বাবুল উইকালাহ পর্যন্ত পৌঁছান। পরবর্তীতে কাজীযাদা আহমদ ইবনু মাহমুদ আল-আদরানাভি (মৃত্যু ৯৮৮ হিজরি) এই কিতাব সম্পূর্ণ করেন।

২. আত তাহরির ফি উসুলিল ফিকহ – হানাফি ও শাফেয়ি উভয়ের পরিভাষা সংযোজক এক গুরুত্বপূর্ণ উসূলুল ফিকহ গ্রন্থ। পরবর্তীতে তাঁর ছাত্র আমিরুল হাজ্জ (মৃত্যু ৮৭৯) এই কিতাব ব্যাখ্যা করেন التقرير والتحبير بشرح التحرير নামে।

৩. আল মুসায়িরাহ ফিল আকাঈদিল মুনজিয়াহ ফিল আখিরাহ – আকিদার গ্রন্থ। যা তিনি ইমাম গাযালির আর-রিসালাতুল কুদসিয়্যার সারসংক্ষেপ করে রচনা করেন এবং নতুন বহু আলোচনা সংযোজন করেন।

চিন্তা করা যায় এক ব্যক্তির জীবন এতটা পূর্ণ ও কর্মোদ্যম হতে পারে। আমাদের ইমাম! আমাদের গর্ব!