আল্লামা ইবনে আতাউল্লাহ সিকান্দারী রহিমাহুল্লাহ

আতাউল্লাহ সিকান্দারী রহিমাহুল্লাহ

মালিকী মাযহাবের ইমাম ও ফকিহদের একটা ব্যাপার দেখবেন তারা প্রত্যেকেই তাসাউউফের কোনো না কোনো ধারার সাথে সংযুক্ত। অর্থাৎ তারা প্রত্যেকেই ফকিহ এবং সুফী দরবেশ। এমনকি মালিকী মাযহাবে তাসাউউফের একাডেমিয়া আছে ও রচনাও আছে। যেমন আহমাদ আয যাররুখ রহিমাহুল্লাহ লিখেছেন – কাওয়াঈদুত তাসাউউফ। খোদ ইমাম মালিক রহিমাহুল্লাহও বলেছেন: যে ব্যক্তি ফকিহ হয়েছে কিন্তু তাসাউউফ লাভ করেনি সে ফাসিক হয়ে গেছে। তো একারণেই দেখা যায় মালিকী ফকিহগণের অধিকাংশই শাযিলী তরিকার সুফী। বিখ্যাত যে কয়েকজন মালিকী ও শাযিলী সুফী ছিলেন তন্মধ্যে অন্যতম হলেন আল্লামা ইবনে আতাউল্লাহ সিকান্দারী রহিমাহুল্লাহ। তাসাউউফের জগতের যুগান্তকারী কিতাব ‘আল হিকামুল আতাইয়্যাহ’র লেখক এই মহান আলিম ও দরবেশের মাকবারায় গিয়েছিলাম। আমার সাথে তার পরিচয় ঘটেছিলো তাসাউউফ নিয়ে দরসগাহে দরস দিতে গিয়ে ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে। আপনাদেরকেও পরিচয় করিয়ে দিই চলুন…

তিনি হলেন আহমদ ইবন মুহাম্মদ ইবন আব্দুল করিম ইবন আতাউল্লাহ ইবন আব্দুর রহমান ইবন আব্দুল করিম ইবন আল-হাসান আল-মালিকি। তার উপাধি ছিল আবু আল-ফযল। ৬৫৮ হিজরিতে আলেকজান্দ্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই জীবনের প্রারম্ভিক সময় কাটান। পরে কায়রোয় চলে যান এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করেন। তিনি এমন এক আলিম পরিবারে জন্ম নেন যেখানে তার দাদা শায়খ আব্দুল করিম ছিলেন বহু গ্রন্থ ও রচনার রচয়িতা এক আলেম। সেই পরিবেশেই ছোটবেলা থেকে তার মধ্যে ইলমের প্রতি ভালোবাসা জন্ম নেয়। তবে জীবনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে তিনি তার দাদার মতোই সুফিবাদের বিরোধী ছিলেন।

শায়খ ইবন আতাউল্লাহ তার যুগের অন্যান্য শিক্ষানুরাগী তরুণদের মতোই জ্ঞানচর্চার পথে এগিয়ে যান। তিনি কুরআন হিফজ করেন। এরপর হাদীস, ফিকহ, উসূল, আরবি ভাষা ও অন্যান্য শরঈ বিদ্যা অধ্যয়ন করেন আলেকজান্দ্রিয়ার মসজিদগুলোতে। পরে তিনি জ্ঞানচর্চা অব্যাহত রাখার উদ্দেশ্যে কায়রো গমন করেন। সে সময় কায়রো ছিল ইসলামী বিশ্বের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র যেখানে উলামায়ে কিরাম একত্র হতেন। বিশেষত তখনকার সময়টি ছিল মামলুকদের শাসন প্রতিষ্ঠার পর যখন তারা তাতারদের বিরুদ্ধে ৬৫৮ হিজরিতে আইন জালুতের যুদ্ধে বিজয়ের পর ইসলামী বিশ্বের রক্ষক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ফলে মিসর ও কায়রোতে তখন ছিল স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা।

ইবন আতাউল্লাহ জ্ঞানার্জনের জন্য গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন। তিনি তাফসির, হাদীস, ফিকহ ও উসূল শিখেছিলেন শায়খ নাসিরুদ্দীন ইবন আল-মুনীরের (মৃত্যু: ৬৮৩ হি./১২৮৪ খ্রি.) কাছ থেকে। এছাড়া তিনি কালাম ও দর্শনের শিক্ষা গ্রহণ করেন শায়খ শামসুদ্দীন আল-ইসফাহানির (মৃত্যু: ৬৮৩ হি./১২৮৪ খ্রি.) কাছ থেকে। একইসঙ্গে তিনি ভাষাবিদ্যায়ও (নাহু ও বালাগাহ বা বাগরীতি ও অলঙ্কারশাস্ত্রে) পারদর্শিতা অর্জন করেন। কিন্তু যৌবনে পৌঁছে তিনি সুফিবাদের বিরোধী পথেই চলতে থাকেন। তিনি শায়খ আবুল আব্বাস আল-মুরসির তাসাউফকে অস্বীকার করতেন এবং সুফিদের সঙ্গে বিতর্কে জড়াতেন ও তাদের মতের বিরোধিতা করতেন। তিনি ফিকহে মূলত মালিকি মাযহাব অনুসারী ছিলেন। যেমন তৎকালীন মিসর ও মাগরিব অঞ্চলের অধিকাংশ আলিম ছিলেন। তার সমসাময়িক এবং বিখ্যাত গ্রন্থ তাবাকাতুশ শাফিয়্যার লেখক তাজুদ্দীন আল-সুবকি ইবন আতাউল্লাহকে শাফিঈ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদিও তিনি নিজেই লিখেছেন যে অনেকে তাকে মালিকি বলেও মনে করেন।

ইবন আতাউল্লাহ কায়রোয় এসেছিলেন ফিকহ ও শরীয়তের জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেখানে একটি ঘটনা তার জীবনদৃষ্টিকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। তিনি সাক্ষাৎ পান বিশিষ্ট সুফি শায়খ আবুল আব্বাস আল-মুরসির যিনি তার শিক্ষক হয়ে ওঠেন। আল-মুরসির বক্তব্য ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা ইবন আতাউল্লাহর হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে। ধীরে ধীরে তার মন পরিবর্তন হয় এবং তিনি সুফিবাদের পথে প্রবেশ করেন। তার নিজের বর্ণনায় জানা যায় আল-মুরসির শিষ্যদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয় আল-মুরসির সোহবত লাভের আগেই। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ লাতাইফুল মিনানে লিখেছেন:

আমি তার (অর্থাৎ আবুল আব্বাস আল-মুরসির) বিরোধীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। তার সমালোচক ছিলাম। তবে এমন কোনো কথা শুনে নয় কিংবা তার সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কিছু জেনে নয়। একবার তার কিছু অনুসারীর সঙ্গে আমার কথোপকথন হয়। তখনও আমি তার সোহবতে যাইনি। আমি তাদের একজনকে বলেছিলাম: জ্ঞান বলতে কেবল প্রকাশ্য শরঈ জ্ঞানই যথেষ্ট! এইসব মানুষ (সুফিরা) যে বিশাল দাবিগুলো করে শরীয়তের প্রকাশ্য বিধান তো তা অস্বীকার করে।

পরে আমি নিজে ভাবলাম: দেখি এই মানুষটিকে (আবুল আব্বাসকে)। কারণ সত্যিকার মানুষকে চিনে নেওয়ার কিছু নিদর্শন থাকে। তা লুকানো থাকে না। আমি তার মজলিসে গেলাম। দেখি তিনি ‘আনফাস’ নিয়ে আলোচনা করছেন। তিনি বললেন: প্রথমটি ইসলাম। দ্বিতীয়টি ঈমান ও তৃতীয়টি ইহসান। চাইলে বলা যায়: প্রথমটি শরীয়ত। দ্বিতীয়টি হাকীকত ও তৃতীয়টি তাহক্কুক (অর্থাৎ সত্যপ্রাপ্তি)।

আমি তখন উপলব্ধি করলাম এই মানুষটি আসলে এক ঐশী সাগরের ফয়েজ থেকে পান করছেন। এক রব্বানী উৎস থেকে শিক্ষা নিচ্ছেন। তখনই আল্লাহ আমার অন্তরের সেই বিরোধিতা দূর করে দিলেন।

পরবর্তীতে তিনি শায়খ আবুল আব্বাস আল-মুরসির ঘনিষ্ঠ শিষ্য ও অনুগামী হয়ে ওঠেন। এমনকি শায়খের মৃত্যুর পর তিনি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন এবং আল আযহার মসজিদে তার স্থানে বসে নসীহাহ দিতেন।

ইবন আতাউল্লাহ তাসাউফে শাযিলী তরিকা অনুসরণ করেন যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শায়খ আবুল হাসান আল-শাযিলী (মৃত্যু: ৬৫৬ হিজরি)। শাযিলীর পর আসেন তার শিষ্য আবুল আব্বাস আল-মুরসি এবং তার পর ইবন আতাউল্লাহ সেই তরিকার প্রধান হন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি আধ্যাত্মিক রাহবার হিসেবে মানুষের কলব সংশোধনের কাজ করে গেছেন।

৭০৯ হিজরিতে এই মহান ফকিহ ও সুফী ইন্তিকাল করেন। ফতহুল কদীরের লেখক কামালুদ্দীন ইবনে হুমাম রহিমাহুল্লাহও ইন্তিকালের সময় নসীহত করে গিয়েছিলেন তাকে যেন ইবনে আতাউল্লাহ সিকান্দারী রহিমাহুল্লাহর কাছেই দাফন করা হয়।