• আল্লামা ওয়াকি ইবনুল জাররাহ রহিমাহুল্লাহ

    এই সেই মহান মারক্বাদ যেখানে শুয়ে আছেন ইমামুল আইম্মাহ আল্লামা ওয়াকি ইবনুল জাররাহ রহিমাহুল্লাহ। যার কাছে ইমাম শাফেঈ গিয়ে বলেছিলেন: উস্তাদ! যা পড়ি সব ভুলে যাই। কী করব বলুন। ওয়াকি তাকে যে নসীহাহ দিয়েছিলেন আজ শত সহস্র বছর ধরে আওড়ানো হচ্ছে তালিবুল ইলমদের উদ্দেশ্যে। শাফেঈ ছন্দে ছন্দে বলেছেন:

    شَكَوتُ إِلى وَكِيعٍ سوءَ حِفظي

    فَأرشَدني إِلى تَركِ المَعاصي

    وأخبرني بِأنَّ العلمَ نورٌ

    ونورُ اللّهِ لا يُهدى لِعاصي

    ওয়াকির সনে বলি আমি যাই ভুলে সবি

    ওয়াকি বলেন গুনাহ ছাড়ো যদি তুমি

    ইলম সে তো কেবল নূরে ইলাহী

    কপালে জোটে না যদি হয় পাপী।

    এই ইমাম ওয়াকি যেন তেন ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। ইমাম আজম রহিমাহুল্লাহর ছাত্র ছিলেন। এই মহান ইমাম ছিলেন হাফিজ। অতি নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিস ও শ্রেষ্ঠ হাদীসবিদদের একজন। বিশিষ্ট ইমামদের অন্তর্ভুক্ত। তিনি এত বড় আলিম ছিলেন যে তার উস্তাদরা পর্যন্ত তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। আর তার উস্তাদের তালিকা বিশাল। প্রসিদ্ধদের মধ্যে আছেন ইমাম আল আওযায়ী থেকে শুরু করে হিশাম ইবনে উরওয়াহ ও সুলাইমান আল আ’মাশ। সুফিয়ান ছাওরী রহিমাহুল্লাহও তার উস্তাদ। কিন্তু উস্তাদ হয়েও ছাত্র থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

    প্রসিদ্ধ ছাত্রদের মধ্যে আছেন আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক। ইবনুল মুবারক তার উস্তাদের চেয়েও বয়সে বড় ছিলেন। হুমায়দীর মত মুহাদ্দিস ওয়াকি ইবনুল জাররাহের ছাত্র। ভাবা যায়!

    ইবনু আম্মার বলেন: ওয়াকির যুগে কুফায় তাঁর চেয়ে বেশি ফিকহবিদ বা হাদীস সম্পর্কে অধিক জ্ঞানী আর কেউ ছিল না।

    ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন: আমার চোখ কোনোদিন ওয়াকির মতো কাউকে দেখেনি। তিনি হাদীস মুখস্থ রাখতেন। ফিকহ নিয়ে আলোচনা করলে সুন্দরভাবে করতেন। তাঁর মধ্যে ছিল তাকওয়া ও অধ্যবসায় এবং তিনি কখনো কারো সম্পর্কে কটু কথা বলতেন না।

    ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন রহিমাহুল্লাহ তো তার উস্তাদকে যুগের আওযায়ী বলতেন।

    তাঁর মৃত্যু হয় ১৯৭ হিজরিতে। আমি যখন এই কবরের সামনে দাঁড়াই তখন আমার অনুভূতি কেমন ছিলো বলে বোঝানোর মত না। বারবার ভাবছিলাম: ইনিই তো তিনি যিনি শাফেঈকে নসীহত করেছিলেন। তার সম্পর্কে এত বড় বড় ইমামরা এত দামী দামী কথা বলেছিলেন। আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ!

  • ইমাম ফখরুদ্দিন জাইলাঈ রহিমাহুল্লাহ

    এখানে শুয়ে আছেন হানাফি ফিকহের বিখ্যাত কিতাব কানযুদ দাকায়িকের সুপ্রসিদ্ধ ব্যাখাগ্রন্থ ‘তাবয়িনুল হাকায়িক ফি শারহি কানযিদ দাকায়িক’ কিতাবের লেখক আল্লামা ফখরুদ্দীন জাইলাঈ। কওমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন কিন্তু ‘কানযুদ দাকায়িক’ পড়েননি এমন কেউ নেই হয়তোবা। কদীম নিসাবে তো ফিকহের প্রথম পাঠটাই শুরু হয় কানযুক দাকাইক দিয়েই। সেই কানয বুঝতে সবাই তাবয়িনুল হাকায়িকের সহায়তা নিয়ে থাকে। কতশত বছর আগে ইমাম ফখরুদ্দিন জাইলাঈ রহিমাহুল্লাহ এই কাজ করে গেছেন ভাবতেই অবাক হই!

    কায়রোর ক্বারাফায় শত শত কবরের মাঝে জীর্ণশীর্ণ এক কবর। খুঁজে বের করতে হয় এই ইমামের কবরখানা। অদূরেই আমর ইবনুল আস ও উকবা ইবনে আমির আল জুহাইনী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমার আরামগাহ। পাশেই আছে জুন্নুন মিসরী ও মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়্যাহ রহিমাহুমাল্লাহর কবর। কিন্তু জাইলাঈ রহিমাহুল্লাহর কবরের দেয়ালে শুধু রং দিয়েই এবড়োখেবড়ো করে লেখা – উসমান জাইলাঈ। এই মহান ফকীহ কে ছিলেন একটু পরিচয় দিই।

    তিনি ছিলেন ফখরুদ্দীন উসমান ইবন আলি ইবন ইউনুস আল-জাইলাঈ আল-হানাফি। মহান ফকিহ ও আলিম। ৭০৫ হিজরিতে কায়রোতে আগমনের পর বহু বছর তিনি ক্বারাফার খানকায় তালিম-ইফতা ও ফিকহ প্রচারে নিয়োজিত ছিলেন। কায়রোতে এসেছিলেন সোমালিয়ার জাইলা এলাকা থেকে। এজন্যই তাকে জাইলাঈ বলা হয়। বহু মানুষ তাঁর কাছ থেকে উপকৃত হন। ফিকহের প্রচার ও প্রসারে তাঁর অবদান ছিল অনন্য। ফিকহ ও নাহু (আরবি ব্যাকরণ) এবং ফারায়েজে (উত্তরাধিকার বিদ্যা) তিনি ছিলেন সুপরিচিত। ছিলেন হানাফি মাযহাবের অন্যতম বিশিষ্ট ফকিহ। তিনি كنز الدقائق গ্রন্থের ওপর ছয় খণ্ডের তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা تبيين الحقائق في شرح كنز الدقائق রচনা করেন। এই কিতাবে তিনি গভীর গবেষণা-বিশ্লেষণ ও সমালোচনা-সংশোধনমূলক কাজ করেন। এই কিতাব আজও হানাফি ফিকহের মূল ব্যাখ্যাগুলির মধ্যে অন্যতম হিসেবে স্বীকৃত।

    তাঁর রচনাসমূহের মধ্যে প্রধান হলো:

    ১. تبيين الحقائق في شرح كنز الدقائق – তাবয়িনুল হাকায়িক

    ২. تركة الكلام على أحاديث الأحكام – হানাফি ফিকহে আলোচিত হাদীসসমূহের বিশ্লেষণ

    ৩. ইমাম মুহাম্মাদ রহিমাহুল্লাহর লেখা জামিউল কাবীরের ব্যাখা – শরহুল জামিয়িল কাবির।

    সারাটা জীবন ফিকহ ফতোয়ার কাজে কাটিয়ে তাঁর মৃত্যু হয় ৭৪৩ হিজরির রমজান মাসে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সমস্ত আমলের সওয়াব মহান ইমামের রুহে বখশে দিন। আমিন।

  • আল্লামা ইবনে হাজার আসক্বলানী রহিমাহুল্লাহ

    সহিহ বুখারীর জগদ্বিখ্যাত ব্যাখাগ্রন্থ ‘ফাতহুল বারী শরহুল বুখারী’ কিতাবের লেখক ইমামুল মুহাদ্দিসীন ও আমিরুল মুমিনীন ফিল হাদিস আল্লামা ইবনে হাজার আসক্বলানী রহিমাহুল্লাহ মারক্বাদ। এতবড় মুহাদ্দিস হয়েও হাদিসের ব্যাপারে একছত্র বস হয়েও শাফেঈ ফিকহ গ্রহণ করেছিলেন। তার সমসাময়িক হানাফি ব্যক্তিত্ব ছিলেন আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী রহ.। এই মাকবারায় ঢোকার সাথে সাথেই চোখের সামনে যেন ভেসে উঠল আমার লাইব্রেরিতে সাজিয়ে রাখা ফাতহুল বারী। কল্পনায় রিলেট করছিলাম আসক্বালানী রহিমাহুল্লাহ দোয়াত কালিতে লিখে চলছেন ফাতহুল বারীর লাইনগুলো। ইয়া সুবহান!

    আসক্বালানীকে চেনে না এমন মানুষ অপ্রতুল। তবুও দুয়েকটা মানাকিব বলি। আসক্বালানী রহিমাহুল্লাহ মাত্র পাঁচ বছর বয়স থেকেই কিতাবপত্র ঘাটাঘাটি শুরু করেন। বারুদের মত মেধাবী ছিলেন। সূরা মারইয়াম মুখস্থ করেছিলেন সেবয়সেই মাত্র একদিনে। প্রতিদিন কুরআনের বড় অংশ মুখস্থ করতেন। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার টেক্সট মুখস্থ করতেন সেই অল্প বয়সেই। আল্লাহ তায়ালা তার অন্তরে ইলমে হাদিসের এমন ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছিলেন যে হাদিসের আদ্যোপান্ত কিছুই বাকী রাখেননি। শাম থেকে ইয়েমেন সহ বহু দেশ সফর করেছেন হাদিসের জন্যই। এজন্যই তার উপাধি হয়ে গেছে আমিরুল মুমিনীন ফিল হাদিস।

    বিয়ে করেছিলেন চারটা। প্রথম স্ত্রী উনস খাতুনও ছিলেন মুহাদ্দিসাহ। প্রচুর ছাত্র গড়েছিলেন। ইবনে হাজার প্রধান বিচারপতির পদের অফার ফিরিয়ে দিয়ে দারস-তাদরীস ও লেখালেখিই বেছে নিয়েছিলেন। তার হাত ধরে রচিত হয়েছে এক মহাকাব্য – ফাতহুল বারী। এই গ্রন্থ রচনা শেষ করার পর গরু জবাই করে সবাইকে খাওয়া দাওয়াও করিয়েছিলেন।

    জীবনের শেষদিকে কোথাও যেতেন না। শুধু লেখালেখি করতেন। ৮৫২ হিজরিতে আশি বছর বয়সে প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে যান। বসে নামাজ পড়তেন। এই অসুস্থতায় তাকে সমসাময়িক সব বড় আলিম দেখতে গিয়েছিলেন। এই অসুস্থতাতেই তিনি ইন্তিকাল করেন। ইবনে তাইমিয়ার পর এত বড় জানাযা আর কারো হয়নি তখন। সুলতান ও অন্যান্য বড় আলিমগণ তার জানাযায় খাটিয়া ধরেন। সারা দেশ শোকে মুহ্যমান হয়ে যায়। বাজারঘাট ও দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি কাফিররা পর্যন্তও শোক করেছিলো। কারণ তিনি ছিলেন মিশরের এসেট।

    আল্লাহ তায়ালা এই মহান ইমামের সাথে আমাদের হাশর করুন। জান্নাতে তার হাদিসের দরসে বসার তাওফিক দান করুন। আমিন।

  • শাইখুল ইসলাম যাকারিয়া আনসারী রহিমাহুল্লাহ

    ইমাম শাফেঈ রহিমাহুল্লাহ মসজিদ ও মাকবারা কমপ্লেক্সের এক কোণায় আরেকটা কবর আছে। এই কবরটা কারো নজর কাড়ে না। আমার ছবির সাথে কবরটা ইমাম শাফেঈর। দ্বিতীয় ছবিটা সেই কোণার কবর। কবর কোণায় হতে পারে কিন্তু ব্যক্তিটা কে ছিলো জানেন? শাইখুল ইসলাম হাফিজুল হাদিস আল্লামা যাকারিয়া আল আনসারী রহিমাহুল্লাহর। অনেকেই তাকে চেনে না। কিন্তু এমন ব্যক্তিত্ব ইসলামের ইতিহাসে খুবই বিরল। ইমাম শাফেঈ রহিমাহুল্লাহকে সবাই জানে তাই ইমামের কথা না বলি। আজ শাইখুল ইসলাম যাকারিয়া আল আনসারীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিই চলুন।

    শাইখুল ইসলাম যাকারিয়া আনসারী রহিমাহুল্লাহ ছিলেন মহান হাফিজুল হাদিস ও সর্ববিদ্যার অধিকারী আলিম। ছিলেন সুলতান কায়তবায় আমলের প্রধান বিচারপতি। তার মুখস্থ শক্তি ছিলো ভয়াবহ রকমের প্রখর। ছোটবেলায় কুরআন তো হিফজ করেছিলেনই পাশাপাশি যা পেতেন তা জ্ঞানের যে শাখারই হোক না কেন ধুমধাম মুখস্থ করে ফেলতেন। উমদাতুল আহকাম যেমন মুখস্থ করেছিলেন তেমনি মুখস্থ করেছিলেন ইমাম ইবনে মালিকের আরবী ব্যকরণ সংক্রান্ত কিতাব আল আলফিয়্যাতুন নাহবিয়্যাহ। ইমাম শাতিবী রহিমাহুল্লাহর কিরাআত বিষয়ক কিতাব শাতিবিয়্যাহও মুখস্থ করে ফেলেছিলেন শৈশবে। কিছুই বাদ রাখেননি।

    এরপর আযহারে ভর্তি হয়ে যান। কেউ ইলমের জন্য কষ্ট করলে যে আল্লাহ তায়ালা তার দীল ইলমে ভরে দেন এর চাক্ষুষ প্রমাণ শাইখুল ইসলাম যাকারিয়া রহিমাহুল্লাহর জীবন। পারিবারিকভাবে দরিদ্র ছিলেন তাই খাওয়া দাওয়া করার মত টাকা পয়সাও থাকতো না পকেটে। সমসাময়িক সহপাঠী বড় আলিম সবাই ধনশালী ছিলেন। যাকারিয়া আনসারী ক্ষুধার যন্ত্রণায় গভীর রাতে আযহার থেকে বের হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা তরমুজের খোসা কুড়িয়ে ধুয়ে খেয়ে ক্ষুধার জ্বালা মেটাতেন। আহা! তবুও ছাড়েননি ইলমচর্চা। আল্লাহ তায়ালাও ইলমের নিয়ামতে এই আলিমের ক্বলব একদম কানায় কানায় পূর্ণ করে দিয়েছিলেন।

    শায়খ আনসারী শুধু ফিকহ-তাফসির-হাদীস ও ধর্মীয় জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি ভাষাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যামিতি, সময় নির্ধারণের জ্ঞান, ফারায়েয, বীজগণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র, ইলমুল আরূদ (ছন্দবিদ্যা), হুরূফবিদ্যা, তাসাউফ, সুন্দর লেখার কৌশল তথা খত্ব এবং গবেষণার নীতি ও আদবও অর্জন করেন। তিনি এসব বিদ্যায় এমন দক্ষতা অর্জন করেন যে উক্ত শাস্ত্রসমূহের আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্ব থেকে ইজাযাহও লাভ করেন। তার যোগ্যতায় মুগ্ধ হয়ে পরবর্তীতে সুলতান কায়তবায় আল-জারকাসি (৮২৬–৯০১ হি.) তাঁকে সর্বোচ্চ বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন। কিন্তু তিনি প্রথমে এই পদ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান এবং বহু অনুরোধ ও তাগিদের পর গ্রহণ করেন।

    যখন তাঁর জ্ঞান ও যোগ্যতার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে তখন লোকেরা তাঁর কাছে উপহার ও অনুদান পাঠাতে থাকে। এমনকি বিচারপতির পদ গ্রহণের আগেই প্রতিদিন তাঁর কাছে প্রায় তিন হাজার দিরহাম আসতো হাদিয়া হিসেবে। তিনি সেই অর্থে বিরল ও মূল্যবান বই সংগ্রহ করেন এবং নিজে যেহেতু ক্ষুধায় কষ্ট পেয়ে ইলম শিখেছেন তাই যেসব ছাত্র তাঁর কাছে পড়তো তাদের জ্ঞান ও অর্থ—দুই দিক থেকেই উপকৃত করতেন। তাদের ভরণপোষণও তিনি হাদিয়ার অর্থ থেকে নির্বাহ করতেন।

    বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি সুলতানের কিছু কাজে সত্য থেকে বিচ্যুতি ও অন্যায় লক্ষ্য করেন এবং সাহসের সঙ্গে সুলতানকে চিঠি লিখে অন্যায় থেকে বিরত থাকতে উপদেশ দেন। এতে সুলতান রুষ্ট হয়ে তাঁকে পদচ্যুত করেন। এরপর তিনি পুনরায় শিক্ষা ও গবেষণার কাজে ফিরে যান এবং জীবনের শেষ পর্যন্ত সেই পথেই অবিচল থাকেন। অনেক লম্বা হায়াত পেয়েছিলেন। জীবনের শেষ দিকে অন্ধ হয়ে গেছিলেন। অনেক কিতাবাদি রচনা করেছিলেন। প্রসিদ্ধ হিসেবে আছে সহিহ বুখারীর ব্যাখা – তুহফাতুল বারী।

    তারাই তো আমাদের পূর্বসূরি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের রুহ ও তাদের রুহ আলমে বারজাখে মিলিয়ে দিন। আমিন।

  • আল্লামা কামালুদ্দীন ইবনুল হুমাম রহিমাহুল্লাহ

    হানাফি ফিকহের সংবিধান বলা যায় ‘হিদায়া’ কিতাবকে। হানাফি ফিকহ বুঝতে হলে হিদায়া ভালোভাবে বুঝতে হবে। আর এই হিদায়া বোঝার জন্য সর্বজনবিদিত ও অনন্য ব্যাখাগ্রন্থ হলো – ফাতহুল কদীর। আট খণ্ডের এই সুবিশাল কিতাবে হিদায়ার সমস্ত রস যেন নিংড়ে নিংড়ে বের করা হয়েছে। আর একাজটি করেছেন এক মহান ফকিহ ও সুফী দরবেশ আল্লামা কামালুদ্দীন ইবনুল হুমাম রহিমাহুল্লাহ। তিনি ছিলেন এমন ইমাম যার দারসে তার উস্তাদ ইবনে হাজার আসকালানি পর্যন্ত বসেছিলেন।

    এই মহান ফকিহের কবরের যিয়ারত আমার নসীব হয়েছে কায়রো এসে আলহামদুলিল্লাহ। হানাফি ফিকহের এই ফকিহের জীবন ও শিক্ষাদীক্ষা এত বৈচিত্র্যময় ছিলো যে বললে অবাক হয়ে যাবেন। চলুন বলি আপনাদেরকে মহান এই ফকিহের ব্যাপারে।

    কামালউদ্দিন মুহাম্মদ ইবনু হুমামুদ্দিন আব্দুল ওয়াহিদ ইবনু সাদুদ্দিন আব্দুল হামিদ রহিমাহুল্লাহর জন্ম আলেকজান্দ্রিয়ায়। তাঁর পরিবার ছিল বিচারকদের পরিবার। যারা মূলত তুরস্কের আনাতোলিয়ার কেন্দ্রস্থল সিওয়াস (سيواس) নগরীর অধিবাসী। তাঁর পিতা থেকে পিতামহ ও প্রপিতামহ সবাই ঐ নগরীতে বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর পিতা কায়রোতে আসেন হানাফি ফিকহের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার জন্য। পরে তিনি আলেকজান্দ্রিয়ার বিচারপতি হন এবং সেখানেই মরক্কোর এক মালিকি বিচারপতির কন্যাকে বিয়ে করেন। ৮০১ হিজরিতে তাঁর পিতা মৃত্যুবরণ করেন। তখন দশ বছর বয়সী কামালউদ্দিন নানীর তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন। নানী তার বিচারকদের বংশধর হিসেবে নাতির উপযুক্ত শিক্ষার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেন। কামালউদ্দিন কুরআনের একটি অংশ হিফজ করেন শায়খ জাইনুদ্দিন আবদুর রহমান ইবনু মনসুর আল-ফাকিরি আল-মালিকির কাছে যিনি আলেকজান্দ্রিয়ার পশ্চিম জামে মসজিদের খতিব ও ইমাম ছিলেন।

    এরপর তাঁর নানী তাঁকে কায়রোতে নিয়ে যান। যেখানে তিনি শায়খ শিহাবুদ্দিন আল-হায়ছামীর কাছে কুরআন সম্পূর্ণ হিফজ সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি তাজবিদ শেখেন বিখ্যাত কারি মুহাম্মদ ইবনু আলী আয-যুরাতিতি আল-হানাফির কাছে। ফিকহে হানাফি শাখায় তিনি মুখতাসারুল কুদুরী ও মানারুল আনওয়ারের মত কিতাব মুখস্থ করে ফেলেন। যামাখশারীর কিতাব আল-মুফাসসাল ও নাহুতে আলফিয়াত ইবনু মালিক মুখস্থ করেন।

    এরপর তাঁর নানী তাঁকে আবার আলেকজান্দ্রিয়ায় ফিরিয়ে আনেন। সেখানে তিনি নাহু শিখেন হানাফি বিচারপতি জামালুদ্দিন ইউসুফ ইবনু মুহাম্মাদ আল-হুমাইদির কাছে। কামালউদ্দিন ফিকহে হানাফি অধ্যয়ন করেন জাইনুদ্দিন আল-ইসকান্দারির কাছে। তাঁর কাছেই তিনি হিদায়ার কিছু অংশের দারস নেন। পরে ইবনুল হুমাম পুনরায় কায়রো ফিরে আসেন এবং যুক্তিবিদ্যা (المنطق) অধ্যয়ন করেন যুগের বিশিষ্ট আলেম ইজ্জুদ্দিন আল-বাগদাদির (আব্দুস সালাম ইবনু আহমদ) কাছে। আকিদাহ ও কালাম অধ্যয়ন করেন ইমাম শামসুদ্দিন আল-বাসাতি আল-মালিকির কাছে।

    ইবনুল হুমাম তাফসীর অধ্যয়ন করেন আল-হামামুদ্দিন আল-খাওয়ারিজমি আশ-শাফেয়ির কাছে। হাদিস শোনেন কামালুদ্দিন আশ-শুমুন্নি আল-মালিকির কাছে। আল-জামালিয়াহ এলাকায় বসবাসকালে তিনি শুমুন্নির সংস্পর্শে অধিক সময় কাটাতেন। তাফসির অধ্যয়ন করেন শায়খ বদরুদ্দিন আল-আকসরাইয়ের কাছে। তাঁরা আলোচনায় এমন গভীরভাবে প্রবেশ করতেন যে কখনোই সহজে উপসংহারে পৌঁছাতে পারতেন না। ৮১৮ হিজরিতে মক্কা থেকে কায়রোতে আগমন করেন প্রসিদ্ধ আলেম ও মুতাকাল্লিম কুতবুদ্দিন মুহাম্মদ আল-আবরাকুহি। ইবনুল হুমাম তাঁর কাছে শরহুল মাওকিফের দরস করেন এবং বলেন: আমার শিক্ষকদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী ছিলেন তিনি।

    ইবনুল হুমাম বদরুদ্দীন আইনী রহিমাহুল্লাহর কাছে আল-মু‘আল্লাকাতুস সাবআ ও জুমহরাতু আশআরিল আরব পড়েন। আইনী তখন কায়রোর আল-মুয়াইয়্যিদিয়াহ মাদরাসার প্রধান ছিলেন এবং ইবনুল হুমামকে সেখানে মুহাদ্দিস হিসেবে নিযুক্ত করেন। ৮১৪ হিজরিতে আল্লামা মুহিব্বুদ্দিন ইবনুশ-শুহনার সঙ্গে ইবনুল হুমাম হালব সফর করেন। ইবনুশ-শুহনা রাজনীতি-সংক্রান্ত কারণে ৮১৩ হিজরিতে কায়রোতে এসেছিলেন। ইবনুল হুমাম তাঁর সংস্পর্শে থেকে হানাফি ফিকহ পড়েন এবং তাঁর সঙ্গে পরে হালব যান। ৮১৫ হিজরিতে শায়খ মৃত্যুবরণ করেন এবং মৃত্যুর আগে তাঁর ছাত্রকে কায়রো ফেরার খরচ দিয়ে যান।

    ইবনুল হুমামের কণ্ঠ ছিল অত্যন্ত মধুর ও সুরেলা। বলা হয় দামেস্কে অবস্থানকালে যখন তিনি সুর করে কিরাআত পাঠ করতেন তখন তাঁর সৌন্দর্যময় কণ্ঠে মুগ্ধ হয়ে স্থানীয়রা তাঁকে হাদিয়া দিতো।

    ৮১৮–৮১৯ হিজরিতে তিনি পুনরায় হানাফি ফিকহ অধ্যয়ন করেন শায়খ সিরাজুদ্দিন উমর ইবনু আলী আল-খাইয়্যাতের কাছে। ইবনুল হুমাম হাফিয ইবনু হাজর আল-আসকালানির কাছেও অধ্যয়ন করেন এবং তাঁর থেকে ইজাজাহ পান। ইবনু হাজর তাঁকে আলিম ও আল্লামা বলে সম্মান করতেন।

    তৎকালীন যুগে কোনো আলেমের পূর্ণ মর্যাদা তখনই হতো যখন তিনি তাসাউফের পথে প্রবেশ করতেন। ইবনুল হুমামও এ পথে অগ্রসর হন। তিনি শায়খ বুরহানুদ্দিন আল-আদকাওয়ি আশ-শাফেয়ি এবং শায়খ জাইনুদ্দিন আল-খাওয়াফি আল-হানাফির শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। খাওয়াফির সঙ্গে তিনি কুদস সফরে যান। যেখানে শায়খ তাঁর জন্য দুআ করেন: হে আল্লাহ তাঁকে কর্মনিষ্ঠ ও সৎ আলেম বানান।

    তাঁর শিক্ষকবৃন্দ ছিলেন বিপুলসংখ্যক। তাঁদের মধ্যে এক অদ্ভুত চরিত্রের শায়খ ছিলেন জালালুদ্দিন আল-কাজুরি আল-কাজউইনি আশ-শাফেয়ি । তিনি অক্ষরবিদ্যা ও অওফাক (তাবিজ-তাবারক) এর জ্ঞান রাখতেন বলে পরিচিত ছিলেন। কায়রোতে এসে তিনি মাদরাসা আল-মানসুরিয়ায় বসবাস শুরু করেন। ইবনুল হুমামও তাঁর সঙ্গে কিছুদিন সেখানে ছিলেন।

    যখন তাঁর শিক্ষা পূর্ণতা পায় তখনই তাঁর জ্ঞানের গভীরতা ও অনন্য বিশ্লেষণক্ষমতা তাঁকে সমসাময়িক আলেমদের মধ্যে অনন্য করে তোলে। তাঁর শায়খ কাজি জাইনুদ্দিন আত-তাফাহনি ৮২২ হিজরিতে হানাফি বিচারপতি নিযুক্ত হলে তাঁকে সহকারী বিচারক করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু ইবনুল হুমাম বিনয়ের সঙ্গে শর্ত দেন যেন তাঁকে আনুষ্ঠানিক আদালতে উপস্থিত থাকতে না হয়। পরিশেষে তিনি পদটি গ্রহণ না করেই প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন: আমি এমন নই যে আমার সমসাময়িকদের চেয়ে নিম্ন জ্ঞান রাখি।

    ৮২২ হিজরিতে তিনি প্রথম আনুষ্ঠানিক পদ লাভ করেন আল-মানসুরিয়াহ কুব্বাহ মাদরাসায় তাফসিরের উস্তাদ হিসেবে। এটি ছিল সুলতান ক্বালাউনের প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান। তাঁর প্রথম দারসে উপস্থিত ছিলেন তাঁর শিক্ষকগণ। ইবনু হাজর থেকে শুরু করে আল-বাসাতি ও কারিউল হিদায়া প্রমুখ ব্যক্তিত্বগণ। তিনি বিনয়ের সঙ্গে আসনে নিচে বসেন এবং এই আয়াত পাঠ করেন:

    يؤتي الحكمة من يشاء ومن يؤت الحكمة فقد أوتي خيراً كثيرا

    এর ব্যাখ্যা শুরু করেন এভাবে: এই আয়াত নিয়ে আলোচনা যেমন আসবে তেমনই করব। যেমন করা উচিত তেমন নয়। এই অনন্য নম্র বাক্যে শ্রোতারা মুগ্ধ হন। ইবনু হাজর তাঁর জ্ঞানের প্রশংসা করেন। আর আল-বাসাতি বলেন: তাঁকে কথা বলতে দিন। তিনি এমন কথা বলেন যার তুলনা নেই।

    পরবর্তী জীবনে ইবনুল হুমাম রাজা-বাদশাহদের সঙ্গে মেলামেশা পরিহার করে কায়রোর উপকণ্ঠ তুরায় নির্জনে বসবাস শুরু করেন। যদিও ছাত্রদের পাঠদান অব্যাহত রাখেন। আলেমদের সাথে তাঁর বিনয় ছিল অতুলনীয়। একদিন তিনি বিখ্যাত আলেম আলাউদ্দিন আল-বুখারির মজলিসে গোপনে প্রবেশ করলে শায়খ তাঁকে সম্মান দিয়ে পাশে বসতে বলেন এবং বলেন: তোমার বিনয় এখানে নয় বরং রাজসভায় সত্য কথা বলাই বিনয়।

    ৮৪৭ হিজরিতে তিনি শায়খুনিয়া খানকাহর প্রধান নিযুক্ত হন। ৮৫৮ হিজরিতে তিনি পদত্যাগ করে হজের উদ্দেশ্যে মক্কা যান এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাসের ইচ্ছা করেন। কিন্তু অসুস্থ হয়ে পড়ায় ৮৬০ হিজরিতে মিশরে ফিরে আসেন এবং ৮৬১ হিজরির ৭ রমজানে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জানাযায় সুলতানসহ বহু মানুষ অংশগ্রহণ করেন। দাফন করা হয় কারাফা কবরস্থানে।

    তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেন। যেগুলোর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো—

    ১. ফাতহুল কদীর – হানাফি ফিকহের বিশাল ব্যাখ্যাগ্রন্থ। এতে তিনি হানাফি মতের প্রমাণাদি এবং হাদিসের তাখরিজ ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তিনি ৮২৯ হিজরিতে গ্রন্থটি শুরু করেন কিন্তু মৃত্যুর (৮৬১ হিজরি) আগে বাবুল উইকালাহ পর্যন্ত পৌঁছান। পরবর্তীতে কাজীযাদা আহমদ ইবনু মাহমুদ আল-আদরানাভি (মৃত্যু ৯৮৮ হিজরি) এই কিতাব সম্পূর্ণ করেন।

    ২. আত তাহরির ফি উসুলিল ফিকহ – হানাফি ও শাফেয়ি উভয়ের পরিভাষা সংযোজক এক গুরুত্বপূর্ণ উসূলুল ফিকহ গ্রন্থ। পরবর্তীতে তাঁর ছাত্র আমিরুল হাজ্জ (মৃত্যু ৮৭৯) এই কিতাব ব্যাখ্যা করেন التقرير والتحبير بشرح التحرير নামে।

    ৩. আল মুসায়িরাহ ফিল আকাঈদিল মুনজিয়াহ ফিল আখিরাহ – আকিদার গ্রন্থ। যা তিনি ইমাম গাযালির আর-রিসালাতুল কুদসিয়্যার সারসংক্ষেপ করে রচনা করেন এবং নতুন বহু আলোচনা সংযোজন করেন।

    চিন্তা করা যায় এক ব্যক্তির জীবন এতটা পূর্ণ ও কর্মোদ্যম হতে পারে। আমাদের ইমাম! আমাদের গর্ব!

  • ইমাম শাতিবী রহিমাহুল্লাহ

    আযহারের কিরাআত ডিপার্টমেন্ট কায়রোর বাইরে তনত্বা এলাকায়। যেখানে আলী তানত্বাভী রহিমাহুল্লাহর অরিজিন। তো আমরা যত মিশরীয় বা আযহার থেকে কিরাআতে অনার্স করা ক্বারী সাহেব দেখি দেশ বিদেশের তারা সবাই এই ডিপার্টমেন্ট থেকেই পাশ করা। এই ডিপার্টমেন্টে একটা কিতাব পড়ানো হয় যার নাম ‘হিরযুল আমানি ওয়া ওয়াজহুত তাহানি ফিল কিরাআত’। এই কিতাব হচ্ছে কিরাআত জগতের সহিহ বোখারী। মানে আপনি যদি প্রফেশনাল ক্বারী হতে চান অথবা পৃথিবীর যত প্রসিদ্ধ ক্বারী দেখা যায় সকলেরই এই হিরযুল আমানি মুখস্থ করতে হয়। এই কিতাব মূলত প্রায় বারোশত পংক্তির একটা কবিতা অথবা বারোশত কবিতার একটা কিতাব। এই কবিতার মূল অনন্যতা হলো এই কবিতা ইলমুল কিরাআতের যাবতীয় নিয়মনীতি ও কুরআন তিলাওয়াতের যত পদ্ধতি সবকিছুর ভাণ্ডার। এই কিতাবের লেখক হচ্ছেন ইলমুল কিরাআত জগতের ইমাম ও পাইওনিয়র ইমাম শাতিবী রহিমাহুল্লাহ। আমি যে কবরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি সেটাই ইমাম শাতিবীর কবর। যিনি কিরাআত জগতের ইমাম বোখারী ও কিরাআতের প্রাতিষ্ঠানিক রূপের জনক।

    তিনি ছিলেন আবু মুহাম্মদ আল-কাসিম ইবন ফিরা ইবন আবিল কাসিম খালাফ ইবন আহমদ আর-রুয়াইনি আশ-শাতিবি আল-দারির (অন্ধ)। তিনি শাফেঈ মাযহাবের আলিম ছিলেন। জন্মগ্রহণ করেন ৫৩৮ হিজরিতে আন্দালুসের পূর্বাঞ্চলের একটি বড় শহর শাতিবায়। যে শহর থেকে বহু আলেম বের হয়েছেন।

    শাতিবী ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। পাশাপাশি ছিলেন পরহেজগার- তাকওয়াবান ও গম্ভীর স্বভাবের একজন আল্লাহভীরু মানুষ। তিনি সাত কিরাআতের উপর বিখ্যাত আশ-শাতিবিয়্যাহ কবিতার গ্রন্থ রচনা করেন যা আগে কেউ করেননি এবং পরেও কেউ তাঁর সমকক্ষ হতে পারেননি। এতে এমন সব প্রতীকী ইঙ্গিত রয়েছে যা কেবল অভিজ্ঞ ও সূক্ষ্মদৃষ্টি সমালোচকই অনুধাবন করতে পারে। অথচ তিনি ছিলেন দৃষ্টিহীন।

    এই গ্রন্থই বর্তমান যুগের ক্বারীদের মুখ্য অবলম্বন। কারণ কিরাআত শিক্ষায় খুব কম মানুষই আছেন যারা এই কিতাবের হিফজ ও জ্ঞানকে অগ্রাধিকার দেন না। তার আরও একটি দালিয়া নামের কবিতা রয়েছে যা প্রায় পাঁচশো কবিতার সমন্বয়ে গঠিত। তিনি কিরাআত, রসম (লিপি), নাহু, ফিকহ ও হাদীসেও অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। নিজ শহর শাতিবায় তিনি আবদুল্লাহ ইবন আবিল আ‘আস আন-নাফরির কাছে সাত কিরাআতের কুরআন তিলাওয়াত শেখেন। পরবর্তীতে তিনি ভ্যালেন্সিয়া সফর করেন এবং সেখানে আবুল হাসান ইবন হুযায়লের কাছেও কিরাআত শিক্ষা গ্রহণ করেন।

    তিনি কুরআনের তিলাওয়াত ও তাফসিরে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসে ছিলেন অনন্য এক ব্যক্তিত্ব। যখন তাঁর সামনে সহীহ বুখারী-মুসলিম ও মুয়াত্তা পাঠ করা হতো তিনি মুখস্থ থেকে পান্ডুলিপিগুলোর সংশোধন করতেন এবং প্রয়োজনীয় স্থানে টীকা ও ব্যাখ্যা দিতেন। অন্ধ ছিলেন কিন্তু এসব হাদিসের কিতাব ছিলো তার মুখস্থ। নাহু ও ভাষাবিজ্ঞানে তিনি ছিলেন অতুলনীয়।

    তিনি অনর্থক কথা বলা থেকে বিরত থাকতেন। শুধুমাত্র পবিত্র অবস্থায় সুন্দর পোশাকে বিনয় ও নম্রতার সঙ্গে কথা বলতেন। গুরুতর অসুস্থ হলেও অভিযোগ করতেন না। দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন না। তিনি তাঁর জন্মভূমি ত্যাগ করে মিসরে চলে যান। তার নিজ দেশ ত্যাগের কারণ ছিল তাকে সেখানে খতিব হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। তিনি হজের অজুহাতে দেশ ত্যাগ করেন এবং আর ফিরে যাননি। কারণ সেখানে খতিবদের রাজাদের প্রশংসাসূচক এমন সব শব্দ ব্যবহার করতে বাধ্য করা হতো যা তিনি শরীয়তের দৃষ্টিতে অনুমোদিত মনে করতেন না। তিনি চরম দারিদ্র্য সত্ত্বেও ধৈর্য ধারণ করেন।

    মিসরে তিনি আস-সিলাফি থেকে শ্রবণ করেন। কাযী আল-ফাযিল তাঁকে নিজের প্রতিষ্ঠিত মাদরাসায় কিরাআত বিভাগের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি কিছু শর্তে তা গ্রহণ করেন এবং সেখানে পাঠদান শুরু করেন। অল্প সময়েই তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং মিসরে ইলমুল কিরাআতের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব তাঁর হাতেই এসে পৌঁছায়। তার থেকে অসংখ্য মানুষ উপকৃত হয়।

    তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস সফর করেন এবং সেখানে একবার রমাদ্বান মাস রোজা রেখে অতিবাহিত করেন। পরে কায়রোতে ফিরে আসেন। সেখানেই ২৮ জমাদিউস সানিতে তাঁর ইন্তিকাল হয়। তাঁকে কারাফা কবরস্থানে কাযী আল-ফাযিলের মাজারের কাছে দাফন করা হয়।

    এই কবরের চাবি এখন ওয়াযারাতুল আওকাফের কাছে আছে। খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়েছে। তবুও বের করেছি। ইলমুল কিরাআত আমার আগ্রহের জায়গা। ইমাম শাতিবীর প্রতি আমার ভালোবাসা আমাকে এই কবর খুঁজে বের করিয়েছে আলহামদুলিল্লাহ।

  • আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ূতি রহিমাহুল্লাহ

    আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ূতি রহিমাহুল্লাহ

    মিশর সরকার চার লেনের রাস্তা সম্প্রসারণের কাজ শুরু করেছে। আশেপাশে অনেক কবর ভেঙে সমান করে ফেলা হচ্ছে। কারো কারোটা সালাফ কোনো আলিমের। খুব বেশি প্রসিদ্ধ হলে দেহাবশেষ অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এরমধ্যে অনেকগুলো কবর পাড়ি দিয়ে ভাঙা রাস্তা মাড়িয়ে এক পুরনো কবরে গেলাম। সবকিছু পুরনো হলেও এখানে যিনি শুয়ে আছেন যুগ থেকে যুগান্তরে তার রেখে যাওয়া চিহ্ন এখনো প্রস্ফুটিত কলির মত তরতাজা। তিনি আর কেউ নন। দ্য গ্রেটেস্ট অফ হিজ টাইম আল্লামাতুত দাহর আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ূতি রহিমাহুল্লাহ। আল্লামা সুয়ূতিই তার সময়ের সম্ভবত একমাত্র আলিম যিনি বইপত্রের মাঝে জন্ম নিয়েছিলেন এবং পারিবারিক সুত্রে অল্প বয়সেই ইলমের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। তার সময়ের আশ্চর্যজনক রচনার সংখ্যাও তার।

    তিনি হলেন জালালুদ্দিন আবদুর রহমান ইবনু আবি বকর ইবনু মুহাম্মাদ ইবন সাবিকুদ্দীন আল-খুজাইরি আস-সুয়ূতি। যিনি জালালুদ্দিন সুয়ূতি নামে প্রসিদ্ধ। তিনি জন্মগ্রহণ করেন কায়রোতে ৮৪৯ হিজরি ১৪৪৫ খ্রিস্টাব্দে এবং মৃত্যুবরণ করেন কায়রোতেই ৯১১ হিজরিতে ১৫০৫ খ্রিস্টাব্দে। তিনি ছিলেন একাধারে হাফিজে কুরআন ও মুফাসসির। ছিলেন ঐতিহাসিক সাহিত্যিক ও শাফেয়ী ফকিহ। তার রচনার সংখ্যা প্রায় ছয়শত। তার উপাধি ছিল ইবনুল কুতুব বা বইয়ের সন্তান। কারণ তার পিতা যখন মায়ের কাছে একটি বই চেয়েছিলেন তখন তার মায়ের প্রসব বেদনা শুরু হয় এবং তিনি ঘরের বইগুলোর মাঝেই সন্তান প্রসব করেন। তাই বাবা তাকে আদর করে নাম দেন – ইবনুল কুতুব।

    জালালুদ্দিন সুয়ূতি এমন এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন যার বংশসূত্র পৌঁছায় আহলে হাকীকত ও তাসাউফের একজন বিশিষ্ট শায়খ হামামুদ্দীন আল-খুজাইরির দিকে। যার নাম থেকে বাগদাদের আল-খুজাইরিয়া মহল্লার নামকরণ। তবে সুয়ূতি নিজে উল্লেখ করেছেন তিনি আনসারী ও জাফারী বংশোদ্ভূত। তিনি কায়রোতে অনাথ অবস্থায় বেড়ে ওঠেন। তার পিতা মারা যান যখন তার বয়স মাত্র পাঁচ বছর। ইমাম সুয়ূতির পিতাও আলিম ছিলেন। তিনি নিজ শহর আসিউতে শাসনকার্যের দায়িত্বও পালন করেছিলেন সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে। তিনি কায়রোতে হাফিজ ইবনু হাজার আসকালানির কাছে সহীহ মুসলিম পড়েছিলেন এবং ফিকহ ও কালামের জ্ঞান অর্জন করেছিলেন ইমাম শামসুদ্দীন আল-কিয়াতির কাছ থেকে।

    ইমাম সুয়ূতির জীবন ছিল জ্ঞানচর্চা ও ইলমি রিহলায় পূর্ণ এক জীবন। জীবনের পুরোটা সময় তিনি ইলম অর্জনের জন্য ভ্রমণ করেছেন। বহু আলিমের সাহচর্যে থেকেছেন। তিনি এমন এক আলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যার দাদা আহলে হাকীকত ও মাশায়িখে তরিকতের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তার পিতা ছিলেন ফিকহ-ফারায়েজ ও আরও বহু শাস্ত্রে প্রজ্ঞাবান এক ইমাম। সুয়ূতি কায়রো শহরে বেড়ে ওঠেন। ছোট্ট সুয়ূতি একদিন পিতার সঙ্গে আসকালানির দরসে অংশগ্রহণ করেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র তিন বছর। তিনি পিতার জীবদ্দশায় কুরআনের সুরা আত-তাহরীম পর্যন্ত মুখস্থ করেছিলেন। ছয় বছর বয়সে তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। এরপর তার অভিভাবক হন শায়খ জামালুদ্দীন ইবনুল হুমাম।

    সুয়ূতি আট বছর বয়সে কুরআন সম্পূর্ণ মুখস্থ করেন। শৈশব থেকেই তার অসাধারণ মেধা ও স্মৃতিশক্তির পরিচয় মেলে। কুরআন হিফজের পর তিনি আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ মুখস্থ করেন। যেমন উমদাতুল আহকাম ও ইমাম নববীর আল-মিনহাজ ফিল ফিকহ এবং আল-মিনহাজ ফিল উসূল। ইবন মালিকের আলফিয়্যা এবং তাফসিরে বাইযাভি। তিনি তখনকার শায়খদের সামনে এসব মুখস্থ অংশ উপস্থাপন করতেন। পনেরো বছর বয়সে পৌঁছার আগেই তিনি ইলমি রিহলাহ শুরু করেন। তিনি দামিয়াত থেকে আলেকজান্দ্রিয়া এবং ফাইয়ুম থেকে মাহাল্লা শহরে গমন করেন। এরপর আল্লাহর ঘর বায়তুল্লাহ শরীফে হজ আদায়ের জন্য মক্কায় যাত্রা করেন এবং সেখানে পূর্ণ এক বছর অবস্থান করেন। পরবর্তীতে তিনি শাম ও মাগরিব এবং বর্তমান গিনি অঞ্চলেও সফর করেন। তিনি বহু আলিমের কাছ থেকে ইলম শেখেন। ইমাম সুয়ূতি এমন এক যুগে বাস করতেন যখন জ্ঞানের প্রায় প্রতিটি শাখায় বহু মহীরূহ আলিম ছিলেন। তারা ইসলামী শাস্ত্র ও ভাষাতত্ত্ব এবং সাহিত্য সৃষ্টিতে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিলেন। সুয়ূতি এই বিশিষ্ট আলিমগণের প্রভাবেই গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। যেমন শামস মুহাম্মাদ ইবন মূসা আল-হানাফি। আশ-শামুস আল-বামী। ইবনুল ফালাতি ও ইবন ইউসুফ। আল-আজলুনি ও আন-নু‘মানি প্রমুখ। তাঁদের কাছ থেকে তিনি ফিকহ এবং নাহু ও অন্যান্য শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। ফরায়েজ শাস্ত্রে তিনি শিক্ষালাভ করেন শায়খ শিহাবুদ্দীন আশ-শারমাসাহির কাছ থেকে।

    সতেরো বছর বয়সে তাকে আরবি ভাষা শেখানোর অনুমতি দেওয়া হয়। এ সময় তিনি ইস্তিআযা ও বিসমিল্লাহ নিয়ে একটি বই রচনা করেন যা প্রশংসা করেন শায়খুল ইসলাম আলিমুদ্দীন আল-বুলকিনী। সাতাশ বছর বয়সে তিনি পাঠদান ও ফতোয়া প্রদান শুরু করেন। এই পর্যায়ে তিনি ইবন মালিকের আলফিয়্যার ব্যাখ্যা ও ‘জামউল জাওয়ামি ফিল আরাবিয়া’ নামে একটি গ্রন্থ লেখেন এবং তা তার শিক্ষক তাকিুদ্দীন আশ-শামসির সামনে উপস্থাপন করলে তিনি প্রশংসা করেন। সুয়ূতি দীর্ঘদিন শায়খ শরফুদ্দীন আল-মুনাওয়ির সাহচর্যে ছিলেন এবং তাঁর কাছ থেকে ফিকহ ও তাফসির গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। সুয়ূতির শিক্ষালাভের একটি বিশেষ পদ্ধতি ছিলো। তিনি এক সময়ে কেবল একজন শায়খের সাহচর্যে থাকতেন এবং তার মৃত্যু হলে অন্য শিক্ষকের কাছে যেতেন। তার প্রধান শিক্ষক ছিলেন মুহিউদ্দীন আল-কাফিজি যার সঙ্গে তিনি টানা চৌদ্দ বছর অবস্থান করেন এবং তার কাছ থেকেই অধিকাংশ ইলম অর্জন করেন। তিনি সুয়ূতিকে উস্তাযুল উজুদ বলে অভিহিত করতেন। আল-কাফিজি তাকে তাফসির ও আরবি উসূল এবং মাআনি শাস্ত্রে ইজাযত (সনদ) প্রদান করেন। পাশাপাশি তিনি শায়খ সাইফুদ্দীন আল-হানাফির দরসেও নিয়মিতভাবে উপস্থিত থেকে ইলম শিখতেন।

    শুধু হাদিস শাস্ত্রেই তিনি প্রায় ১৫০ জন বিশিষ্ট আলিমের কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করেন। তার শিক্ষাগ্রহণ শুধু পুরুষ আলিমগণের কাছেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বেশ কিছু মহিলার কাছ থেকেও ইলম অর্জন করেছিলেন যারা সে যুগের উচ্চপদস্থ ও বিশিষ্ট আলিমা ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: আসিয়া বিনতু জারুল্লাহ ইবন সালিহ। কামালিয়া বিনতু মুহাম্মদ আল-হাশিমিয়া। উম্মু হানি বিনতু আবিল হাসান আল-হারউইনিয়া। উম্মুল ফাজল বিনতু মুহাম্মদ আল-মাকদিসিয়া প্রমুখ।

    জালালুদ্দিন সুয়ূতি রহিমাহুল্লাহ বিপুলসংখ্যক গ্রন্থ ও পুস্তিকা রচনা করেছেন। সুয়ূতির রচনার সংখ্যা তিনশত গ্রন্থ ও পত্রেরও বেশি। জার্মান প্রাচ্যবিদ ব্রোকলমান তার চারশত পনেরোটি গ্রন্থের তালিকা করেছেন। হাজী খলিফা তাঁর কাশফুয যুনূন গ্রন্থে প্রায় পাঁচশত ছিয়াত্তরটি রচনা উল্লেখ করেছেন। এবং ইবন ইয়াসের মতে তার রচনার সংখ্যা পৌঁছেছিল ছয়শতে। তিনি তাফসির, ফিকহ, হাদীস, উসূল (ইসলামী আইনতত্ত্ব), নাহু (ব্যাকরণ), বালাগাত (অলঙ্কার ও ভাষার শৈলী), ইতিহাস, তাসাউফ (আধ্যাত্মিকতা), সাহিত্য এবং আরও বহু বিষয়ে রচনা করেছেন। এইসব রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে তাঁর অসংখ্য বিশিষ্ট ও প্রভাবশালী গ্রন্থ যা ইসলামী জ্ঞানের প্রায় সব শাখাকে আচ্ছাদিত করেছে।

    জালালুদ্দিন সুয়ূতির এত বিপুল রচনাকর্ম সম্ভব হয়েছিলো নির্জনতার কারণে। তিনি চল্লিশ বছর বয়সের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে কর্মজীবন ও সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে লেখালেখিতে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। এর পাশাপাশি ছিল তার বিশাল গ্রন্থাগার ও জ্ঞানের প্রাচুর্য। অসংখ্য শিক্ষক ও রিহলাহর অভিজ্ঞতা এবং দ্রুত লেখার ক্ষমতা। তার রচনাজীবন দীর্ঘ ছিল প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর। তিনি মাত্র সতেরো বছর বয়সে লেখালেখি শুরু করেন এবং টানা বাইশ বছর সম্পূর্ণভাবে এর জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেন। যদি তার লিখিত কাগজের পরিমাণ জীবনের দিনসংখ্যায় ভাগ করা হয় তবে প্রতিদিন গড়ে চল্লিশ পৃষ্ঠা লিখেছেন বলা যায়। চল্লিশ বছর বয়সে পৌঁছে তিনি মানুষজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান এবং নীলনদের তীরে রাওদাতুল মিকইয়াস নামে স্থানে নির্জনে অবস্থান নিতে শুরু করেন। তিনি সেখানে একাকী জীবনযাপন করেন। এমনকি তার ঘনিষ্ঠ সাথীদের সঙ্গেও সম্পর্ক ছিন্ন করেন যেন কাউকেই চিনতেন না। এই নির্জন জীবনে থেকেই তিনি তার অধিকাংশ বই রচনা করেন।

    ধনী ও অভিজাতরা তাকে দেখতে আসতেন। অর্থ ও উপহার দিতেন কিন্তু তিনি সব ফিরিয়ে দিতেন। সুলতান একাধিকবার তাকে ডেকেছিলেন ও উপহার পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি উপস্থিত হননি এবং উপহারও গ্রহণ করেননি। এই অবস্থাতেই তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্থির ছিলেন।

  • আল্লামা ইবনে আতাউল্লাহ সিকান্দারী রহিমাহুল্লাহ

    আল্লামা ইবনে আতাউল্লাহ সিকান্দারী রহিমাহুল্লাহ

    মালিকী মাযহাবের ইমাম ও ফকিহদের একটা ব্যাপার দেখবেন তারা প্রত্যেকেই তাসাউউফের কোনো না কোনো ধারার সাথে সংযুক্ত। অর্থাৎ তারা প্রত্যেকেই ফকিহ এবং সুফী দরবেশ। এমনকি মালিকী মাযহাবে তাসাউউফের একাডেমিয়া আছে ও রচনাও আছে। যেমন আহমাদ আয যাররুখ রহিমাহুল্লাহ লিখেছেন – কাওয়াঈদুত তাসাউউফ। খোদ ইমাম মালিক রহিমাহুল্লাহও বলেছেন: যে ব্যক্তি ফকিহ হয়েছে কিন্তু তাসাউউফ লাভ করেনি সে ফাসিক হয়ে গেছে। তো একারণেই দেখা যায় মালিকী ফকিহগণের অধিকাংশই শাযিলী তরিকার সুফী। বিখ্যাত যে কয়েকজন মালিকী ও শাযিলী সুফী ছিলেন তন্মধ্যে অন্যতম হলেন আল্লামা ইবনে আতাউল্লাহ সিকান্দারী রহিমাহুল্লাহ। তাসাউউফের জগতের যুগান্তকারী কিতাব ‘আল হিকামুল আতাইয়্যাহ’র লেখক এই মহান আলিম ও দরবেশের মাকবারায় গিয়েছিলাম। আমার সাথে তার পরিচয় ঘটেছিলো তাসাউউফ নিয়ে দরসগাহে দরস দিতে গিয়ে ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে। আপনাদেরকেও পরিচয় করিয়ে দিই চলুন…

    তিনি হলেন আহমদ ইবন মুহাম্মদ ইবন আব্দুল করিম ইবন আতাউল্লাহ ইবন আব্দুর রহমান ইবন আব্দুল করিম ইবন আল-হাসান আল-মালিকি। তার উপাধি ছিল আবু আল-ফযল। ৬৫৮ হিজরিতে আলেকজান্দ্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই জীবনের প্রারম্ভিক সময় কাটান। পরে কায়রোয় চলে যান এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করেন। তিনি এমন এক আলিম পরিবারে জন্ম নেন যেখানে তার দাদা শায়খ আব্দুল করিম ছিলেন বহু গ্রন্থ ও রচনার রচয়িতা এক আলেম। সেই পরিবেশেই ছোটবেলা থেকে তার মধ্যে ইলমের প্রতি ভালোবাসা জন্ম নেয়। তবে জীবনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে তিনি তার দাদার মতোই সুফিবাদের বিরোধী ছিলেন।

    শায়খ ইবন আতাউল্লাহ তার যুগের অন্যান্য শিক্ষানুরাগী তরুণদের মতোই জ্ঞানচর্চার পথে এগিয়ে যান। তিনি কুরআন হিফজ করেন। এরপর হাদীস, ফিকহ, উসূল, আরবি ভাষা ও অন্যান্য শরঈ বিদ্যা অধ্যয়ন করেন আলেকজান্দ্রিয়ার মসজিদগুলোতে। পরে তিনি জ্ঞানচর্চা অব্যাহত রাখার উদ্দেশ্যে কায়রো গমন করেন। সে সময় কায়রো ছিল ইসলামী বিশ্বের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র যেখানে উলামায়ে কিরাম একত্র হতেন। বিশেষত তখনকার সময়টি ছিল মামলুকদের শাসন প্রতিষ্ঠার পর যখন তারা তাতারদের বিরুদ্ধে ৬৫৮ হিজরিতে আইন জালুতের যুদ্ধে বিজয়ের পর ইসলামী বিশ্বের রক্ষক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ফলে মিসর ও কায়রোতে তখন ছিল স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা।

    ইবন আতাউল্লাহ জ্ঞানার্জনের জন্য গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন। তিনি তাফসির, হাদীস, ফিকহ ও উসূল শিখেছিলেন শায়খ নাসিরুদ্দীন ইবন আল-মুনীরের (মৃত্যু: ৬৮৩ হি./১২৮৪ খ্রি.) কাছ থেকে। এছাড়া তিনি কালাম ও দর্শনের শিক্ষা গ্রহণ করেন শায়খ শামসুদ্দীন আল-ইসফাহানির (মৃত্যু: ৬৮৩ হি./১২৮৪ খ্রি.) কাছ থেকে। একইসঙ্গে তিনি ভাষাবিদ্যায়ও (নাহু ও বালাগাহ বা বাগরীতি ও অলঙ্কারশাস্ত্রে) পারদর্শিতা অর্জন করেন। কিন্তু যৌবনে পৌঁছে তিনি সুফিবাদের বিরোধী পথেই চলতে থাকেন। তিনি শায়খ আবুল আব্বাস আল-মুরসির তাসাউফকে অস্বীকার করতেন এবং সুফিদের সঙ্গে বিতর্কে জড়াতেন ও তাদের মতের বিরোধিতা করতেন। তিনি ফিকহে মূলত মালিকি মাযহাব অনুসারী ছিলেন। যেমন তৎকালীন মিসর ও মাগরিব অঞ্চলের অধিকাংশ আলিম ছিলেন। তার সমসাময়িক এবং বিখ্যাত গ্রন্থ তাবাকাতুশ শাফিয়্যার লেখক তাজুদ্দীন আল-সুবকি ইবন আতাউল্লাহকে শাফিঈ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদিও তিনি নিজেই লিখেছেন যে অনেকে তাকে মালিকি বলেও মনে করেন।

    ইবন আতাউল্লাহ কায়রোয় এসেছিলেন ফিকহ ও শরীয়তের জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেখানে একটি ঘটনা তার জীবনদৃষ্টিকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। তিনি সাক্ষাৎ পান বিশিষ্ট সুফি শায়খ আবুল আব্বাস আল-মুরসির যিনি তার শিক্ষক হয়ে ওঠেন। আল-মুরসির বক্তব্য ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা ইবন আতাউল্লাহর হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে। ধীরে ধীরে তার মন পরিবর্তন হয় এবং তিনি সুফিবাদের পথে প্রবেশ করেন। তার নিজের বর্ণনায় জানা যায় আল-মুরসির শিষ্যদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয় আল-মুরসির সোহবত লাভের আগেই। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ লাতাইফুল মিনানে লিখেছেন:

    আমি তার (অর্থাৎ আবুল আব্বাস আল-মুরসির) বিরোধীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। তার সমালোচক ছিলাম। তবে এমন কোনো কথা শুনে নয় কিংবা তার সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কিছু জেনে নয়। একবার তার কিছু অনুসারীর সঙ্গে আমার কথোপকথন হয়। তখনও আমি তার সোহবতে যাইনি। আমি তাদের একজনকে বলেছিলাম: জ্ঞান বলতে কেবল প্রকাশ্য শরঈ জ্ঞানই যথেষ্ট! এইসব মানুষ (সুফিরা) যে বিশাল দাবিগুলো করে শরীয়তের প্রকাশ্য বিধান তো তা অস্বীকার করে।

    পরে আমি নিজে ভাবলাম: দেখি এই মানুষটিকে (আবুল আব্বাসকে)। কারণ সত্যিকার মানুষকে চিনে নেওয়ার কিছু নিদর্শন থাকে। তা লুকানো থাকে না। আমি তার মজলিসে গেলাম। দেখি তিনি ‘আনফাস’ নিয়ে আলোচনা করছেন। তিনি বললেন: প্রথমটি ইসলাম। দ্বিতীয়টি ঈমান ও তৃতীয়টি ইহসান। চাইলে বলা যায়: প্রথমটি শরীয়ত। দ্বিতীয়টি হাকীকত ও তৃতীয়টি তাহক্কুক (অর্থাৎ সত্যপ্রাপ্তি)।

    আমি তখন উপলব্ধি করলাম এই মানুষটি আসলে এক ঐশী সাগরের ফয়েজ থেকে পান করছেন। এক রব্বানী উৎস থেকে শিক্ষা নিচ্ছেন। তখনই আল্লাহ আমার অন্তরের সেই বিরোধিতা দূর করে দিলেন।

    পরবর্তীতে তিনি শায়খ আবুল আব্বাস আল-মুরসির ঘনিষ্ঠ শিষ্য ও অনুগামী হয়ে ওঠেন। এমনকি শায়খের মৃত্যুর পর তিনি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন এবং আল আযহার মসজিদে তার স্থানে বসে নসীহাহ দিতেন।

    ইবন আতাউল্লাহ তাসাউফে শাযিলী তরিকা অনুসরণ করেন যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শায়খ আবুল হাসান আল-শাযিলী (মৃত্যু: ৬৫৬ হিজরি)। শাযিলীর পর আসেন তার শিষ্য আবুল আব্বাস আল-মুরসি এবং তার পর ইবন আতাউল্লাহ সেই তরিকার প্রধান হন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি আধ্যাত্মিক রাহবার হিসেবে মানুষের কলব সংশোধনের কাজ করে গেছেন।

    ৭০৯ হিজরিতে এই মহান ফকিহ ও সুফী ইন্তিকাল করেন। ফতহুল কদীরের লেখক কামালুদ্দীন ইবনে হুমাম রহিমাহুল্লাহও ইন্তিকালের সময় নসীহত করে গিয়েছিলেন তাকে যেন ইবনে আতাউল্লাহ সিকান্দারী রহিমাহুল্লাহর কাছেই দাফন করা হয়।